হিমবাহ ধসের পর সুনামির মতো নেমে আসা কাদা, পাথর ও পানির প্রবল স্রোতে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে চীন-নেপাল সীমান্তের ব্যস্ত গিরং স্থলবন্দর। গত ২৬ আগস্ট নেপাল অংশে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে চীনের তিব্বত ও নেপালকে সংযুক্ত করা এই গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথটি ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত হয়। দুই দেশে এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে এবং এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজারের বেশি মানুষ।
রোববার প্রায় ২০ জন চীনা উদ্ধারকর্মী খননযন্ত্র, কোদাল ও ভূগর্ভে অনুসন্ধানের রাডার ব্যবহার করে গিরং বন্দরের ধ্বংসস্তূপে নিখোঁজদের সন্ধান চালান। উদ্ধারকাজের জন্য এলাকাটিকে সাতটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি এলাকায় অনুসন্ধান শেষ হয়েছে এবং বাকি তিনটিতে অভিযান চলছে। গভীর কাদা, পাথরের স্তূপ, ভূমিধসের আশঙ্কা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
রয়টার্সসহ বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় প্রথমবারের মতো বিধ্বস্ত গিরং বন্দর পরিদর্শন করেছেন। সেখানে একসময় থাকা পাঁচতলা চীনা কাস্টমস ভবনের এখন আর কোনো চিহ্ন নেই। প্রায় ২০ মিটার উঁচু সীমান্ত ফটকটিও কাদার স্রোতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ফটকটির জায়গায় উদ্ধারকর্মীরা একটি চীনা পতাকা স্থাপন করেছেন। পুরো এলাকাটি এখন পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে।
সর্বশেষ হিসাবে চীনের তিব্বত অংশে ৪৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ৫১৯ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৩ দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৯ জন ভারতীয়। নিখোঁজ বিদেশিদের বড় একটি অংশ ছিলেন কৈলাস-মানসসরোবর তীর্থযাত্রী। বিভিন্ন দেশের নিখোঁজ নাগরিকদের স্বজনরা চীনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আরও তথ্য, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে স্বচ্ছতা দাবি করছেন।
উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করতে গিরংয়ে প্রবেশের একমাত্র সড়কপথ পুনরায় চালু করা হয়েছে। আগে বন্যা ও ভূমিধসে সড়কটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ভারী যন্ত্রপাতি ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছিল না। সড়ক চালু হওয়ার পর খননযন্ত্র ও অন্যান্য উদ্ধার সরঞ্জাম ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও ধীরে ধীরে পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে।
গত এক দশকে গিরং চীন ও নেপালের মধ্যে বাণিজ্য এবং যাত্রী চলাচলের অন্যতম প্রধান সীমান্তপথে পরিণত হয়েছিল। এই পথ দিয়ে চীনা পণ্য ও বৈদ্যুতিক গাড়ি নেপালে যেত। একই সঙ্গে প্রতিবছর হাজারো হিন্দু তীর্থযাত্রী এই সীমান্তপথ ব্যবহার করে তিব্বতের কৈলাস ও মানসসরোবরের উদ্দেশে যেতেন। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পে নেপাল-চীন সীমান্তের পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর গিরংয়ের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
এবারের দুর্যোগে শুধু সীমান্তবন্দর নয়, পুরো সীমান্তবর্তী অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের ত্রিশূলী নদী উপত্যকায় গ্রাম, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। রয়টার্সের হিসাবে নেপালে প্রায় ২০ হাজার বাড়ি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে এবং অবকাঠামো ও সম্পদের ক্ষতির পরিমাণও কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
গিরং বন্দর ধ্বংসের ঘটনা হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদ থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিকেও সামনে এনেছে। চীনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিব্বতে শত শত হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং উচ্চঝুঁকির এলাকাগুলোতে দূরবর্তী সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং নেপাল-চীন সীমান্তজুড়ে তথ্য বিনিময় বাড়ানো জরুরি।
একসময় যেখানে ছিল ব্যস্ত কাস্টমস ভবন, উঁচু সীমান্ত ফটক, পর্যটক ও তীর্থযাত্রীর আনাগোনা—আজ সেখানে শুধু কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপ। গিরংয়ের এই চিত্র শুধু একটি সীমান্তবন্দর ধ্বংসের ঘটনা নয়; এটি হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশ ও চরম দুর্যোগের ভয়াবহতারও প্রতীক হয়ে উঠেছে।



