বিশ্বে তেলের দাম কমছে, বাংলাদেশে বাড়ছে — এ কেমন অর্থনীতি?

বিশ্বে তেলের দাম কমছে, বাংলাদেশে বাড়ছে — এ কেমন অর্থনীতি?

বাংলাদেশে যখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল লিটারে ২০ টাকা, ঠিক একই দিনে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমল ২ শতাংশের বেশি।

গতকাল ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে নতুন দাম। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী,

ডিজেল: ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন: ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল: ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন: ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা

অর্থাৎ চারটি পণ্যেই এক লাফে ২০ টাকা বৃদ্ধি।

আর ঠিক একই দিনে রয়টার্স, ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, ব্রেন্ট ক্রুড: ১০৩.০৬ ডলার থেকে কমে ১০১.৭১ ডলার (-২.০৮%)

ডব্লিউটিআই ক্রুড: ৯৯.৪১ ডলার থেকে কমে ৯৮.১৫ ডলার (-২.১৪%)

গত ১০ সেপ্টেম্বরের পর এটাই সর্বনিম্ন দাম। কারণ? সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হুথি হামলার পরও রিয়াদ বিকল্প পথে রপ্তানি বাড়িয়েছে। বাজারে সরবরাহ নিয়ে আতঙ্ক কমেছে। দাম পড়ছে।

তাহলে বাংলাদেশে বাড়ল কেন?

সরকারের ব্যাখ্যা: জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ইরান-ইসরায়েল

-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ (জাহাজ ভাড়া) অস্বাভাবিক বেড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সেই চাপ নিতে পারেনি।

মার্চ থেকে আগস্ট — ৬ মাসে বিপিসির লোকসান ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা

শুধু ডিজেল বিক্রিতে প্রতি লিটারে লোকসান ৮৯ টাকা দৈনিক লোকসান ১০৯ কোটি টাকা এই ধারা চললে বছরে শুধু ডিজেলেই লোকসান ৪০ হাজার কোটি টাকা

সরকার বলছে: “আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণ বাড়লেও দেশে আমরা বাড়াইনি, এখন বাধ্য হয়ে সমন্বয় করছি।

এবং আরও একটি যুক্তি — “ভারত, পাকিস্তানে ডিজেল ১৩৫-১৪০ টাকার বেশি, পাচার ঠেকাতে দাম বাড়াতে হয়েছে।”

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও গতকাল একই সুরে বলেছেন — “বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় এখনো বাংলাদেশে তেলের দাম কম। বাড়ানোর পরও প্রতি লিটারে ১৪ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।”

প্রশ্ন হচ্ছে, যদি যুক্তি হয় আন্তর্জাতিক বাজার, তাহলে বাজার যখন কমছে, তখন কেন বাড়ল? জনগণকে বোঝানো হচ্ছে — আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় বাড়ানো হলো, অথচ যেদিন বাড়ানো হলো, সেদিনই বাজার পড়ল। এটা তামাশা নয় কি?

বিপিসি একটি একচেটিয়া আমদানিকারক সংস্থা। তারা যখন কম দামে কেনে, তখন লাভের টাকা কোথায় যায়? ২০২২-২৩ সালে বিপিসি ৪০ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছিল, সেই টাকা কোথায়? লাভ হলে সরকার নেয়, লোকসান হলে জনগণ দেয় — এ কেমন হিসাব?

ডিজেল মানে গণপরিবহন, ট্রাক, লরি, কৃষি। একটি বাসে দিনে ১০০ লিটার ডিজেল লাগে, ২০ টাকা বাড়া মানে দিনে ২০০০ টাকা খরচ বাড়া। সেই টাকা যাত্রীর পকেট থেকে যাবে। কৃষকের সেচ পাম্প ডিজেলে চলে। এখন ধান কাটার মৌসুম। কৃষকের খরচ বাড়বে ১৫-২০%। কেরোসিন ব্যবহার করে গ্রামের গরিব মানুষ। তাদের ওপর ২০ টাকা মানে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

সরকার বলছে — “পরিবহন ভাড়া বাড়বে না”। কিন্তু বাংলাদেশে কবে ভাড়া না বেড়েছে? আজ থেকেই ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বাস মালিকরা ১০০ টাকা বাড়তি নিচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক বাজারে ১ ব্যারেল = ১৫৯ লিটার। ১০১ ডলার মানে প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৭৯ টাকা (১ ডলার = ১২৪ টাকা ধরে)। সেই তেল পরিশোধন করে ১৩৫-১৬৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। ৭৯ টাকার তেল ১৬৫ টাকা — ৮৬ টাকা কোথায় যায়? ট্যাক্স, ভ্যাট, বিপিসির কমিশন, ডিলার কমিশন। সরকার নিজেই তেলের ওপর ৩০% এর বেশি কর নিচ্ছে। নিজের কর কমালেই তো দাম কমে।

রোববার রাত ১০টায় প্রজ্ঞাপন, সোমবার সকাল থেকে কার্যকর। মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখে দাম বেড়ে গেছে। কোনো গণশুনানি নেই, কোনো আলোচনা নেই। এটা গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণ?

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমছে, এটা বাংলাদেশের জন্য সুখবর হওয়ার কথা ছিল। কারণ আমরা ৯০% তেল আমদানি করি। দাম কমলে আমাদের আমদানি ব্যয় কমবে, রিজার্ভ বাঁচবে।

কিন্তু উল্টো হলো। বিশ্বে কমল, দেশে বাড়ল।

কারণটা পরিষ্কার — বিপিসির লোকসান পোষাতে সরকার জনগণের পকেট কাটছে। বিপিসির অদক্ষতা, দুর্নীতি, ভুল সময়ে কেনার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।

তেলের দাম বাড়া মানে শুধু পেট্রোলের দাম বাড়া না — এটা চাল, ডাল, তেল, সবকিছুর দাম বাড়া। আজ ২০ টাকা বাড়ল, কাল বাজারে সবকিছুর দাম বাড়বে ৫ টাকা করে। সরকারকে বলব — বিশ্ববাজারের দোহাই দেওয়া বন্ধ করুন। যদি বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয়ই করতে হয়, তাহলে যখন কমে, তখনও কমান। আর যদি ভর্তুকি দিতেই হয়, তাহলে বিপিসির লাভের টাকা থেকে দিন, গরিবের পকেট থেকে না।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৬
  • ১১:৫০
  • ৪:১১
  • ৫:৫৭
  • ৭:১০
  • ৫:৪০