সাড়ে ৫ বছর পর টাকার “শক্তিশালী” হওয়ার গল্প, আসলে কতটা শক্তিশালী?

সাড়ে ৫ বছর পর টাকার “শক্তিশালী” হওয়ার গল্প, আসলে কতটা শক্তিশালী?

নিজাম উদ্দিন সালেহ :

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক খুব গর্ব করে একটা প্রতিবেদন দিয়েছে — “সাড়ে ৫ বছর পর ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হলো টাকা”। পত্রিকায় হেডলাইন হয়েছে, “টাকার গায়ে জোর বেড়েছে”।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ৩০ আগস্ট ২০২৬: ১ ডলার = ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা (সর্বোচ্চ), ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ১ ডলার = ১২৩ টাকা ০৫ পয়সা অর্থাৎ ১৮ দিনে টাকা শক্তিশালী হয়েছে ৯৫ পয়সা। শতকরা হিসাবে ০.৭৭%।

আর গত এক বছরে (জুন ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬) টাকা শক্তিশালী হয়েছে ০.০৬%— মানে ২১ পয়সা। ১২২.৯৬ টাকা থেকে ১২২.৭৫ টাকা।

এই ২১ পয়সা বা ৯৫ পয়সাকে বলা হচ্ছে “শক্তিশালী”।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে: ১ ডলার = ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা, ২০২৬ আগস্টে: ১ ডলার = ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা অর্থাৎ ৫ বছরে টাকার মান কমেছে ৩৮ টাকা ২০ পয়সা, কমেছে ৪৫.০৫%।

আপনার পকেটে ২০২১ সালে ১০০ টাকা ছিল, তার আসল মূল্য এখন ৫৫ টাকা। আপনি ৪৫ টাকা হারিয়েছেন। এখন ৯৫ পয়সা ফেরত পেয়ে আপনি কি খুশি হবেন?

এটা অনেকটা এরকম — আপনার কাছ থেকে ৩৮ হাজার টাকা কেড়ে নিয়ে, ৯৫ পয়সা ফেরত দিয়ে বলা — “দেখো, তোমাকে টাকা ফেরত দিয়েছি, তুমি এখন ধনী।”

কিন্তু গত এক বছরে রিজার্ভ ২৪.৮৬ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৩১.৬০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। কারণ? প্রবাসীরা বেশি টাকা পাঠিয়েছেন, কারণ ডলারের দাম বেশি ছিল। আর আইএমএফের ঋণের টাকা এসেছে। এটা দিয়ে ডলারের বাজার সামলানো হয়েছে। দেশের রপ্তানি বাড়েনি।

ডলার সংকটের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি খোলা কঠিন করে দিয়েছে। আমদানি কমলে ডলারের চাহিদা কমে, টাকার দাম একটু বাড়ে। কিন্তু আমদানি কমা মানে কল-কারখানার কাঁচামাল আসছে না, শিল্প বন্ধ হচ্ছে। এটা কি ভালো লক্ষণ?

গত বছর আইএমএফের চাপে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারভিত্তিক ডলার রেট চালু করতে বাধ্য হয়েছে। আগে ৮৫ টাকায় আটকে রাখা হতো। এখন ছেড়ে দেওয়ায় ১২৩ টাকায় গেছে। এই ১২৩ টাকাকে এখন “স্থিতিশীল” বলা হচ্ছে। আসলে এটা স্থিতিশীল না, এটা অনেক উঁচুতে আটকে থাকা।

টাকার মান একটু বাড়লে সবচেয়ে ক্ষতি হয় দুই শ্রেণির: একজন গার্মেন্টস মালিক ১ ডলারের পণ্য রপ্তানি করে আগে ১২৩.৯৫ টাকা পেতেন, এখন পাবেন ১২৩ টাকা। তার আয় কমল। অথচ তার শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, সুদের হার — সব বেড়েছে। ভারতে রুপি গত এক বছরে ৮.৯৪% কমেছে, ফলে ভারতীয় পণ্য বিশ্ববাজারে সস্তা হয়েছে। বাংলাদেশের পণ্য দামি হয়েছে। আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাব।

একজন প্রবাসী ১০০ ডলার পাঠালে আগে পরিবার পেত ১২,৩৯৫ টাকা, এখন পাবে ১২,৩০০ টাকা। ৯৫ টাকা কম। প্রবাসীরা তখন হুন্ডিতে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হবেন, কারণ হুন্ডিতে রেট বেশি। ফলে বৈধ রেমিট্যান্স আবার কমবে।

লাভ শুধু আমদানিকারকদের। যারা বিলাসবহুল গাড়ি, বিদেশি ফল, প্রসাধনী আমদানি করেন, তাদের খরচ একটু কমবে। সাধারণ মানুষের কী লাভ? বাজারে চালের দাম কমেছে? ডালের দাম কমেছে? না।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, “দক্ষিণ এশিয়ায় টাকা স্থিতিশীল”। কিন্তু স্থিতিশীলতা মানে কী? ১২৩ টাকায় স্থিতিশীল থাকা মানে ৮৫ টাকা থেকে ৪৫% পড়ে গিয়ে সেখানে স্থিতিশীল থাকা। এটা অনেকটা কোমায় থাকা রোগীকে স্থিতিশীল বলার মতো। টাকার মান ৯৫ পয়সা বাড়া নিয়ে উৎসব করার কিছু নেই। উৎসব তখন হবে, যখন টাকা ১০০ টাকার নিচে নামবে। যখন ৮৫ টাকায় ফিরবে।

সেটা করতে হলে রেমিট্যান্স বা আইএমএফের ঋণ দিয়ে নয়, রপ্তানি বাড়িয়ে, দেশে বিনিয়োগ বাড়িয়ে, দুর্নীতি কমিয়ে ডলার আনতে হবে।

৯৫ পয়সার এই “গায়ে জোর” আসলে টাকার জোর নয়, এটা সাময়িক ব্যথানাশক। আসল রোগ — ৪৫% অবমূল্যায়ন — সেটা এখনো আছে।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৬
  • ১১:৫০
  • ৪:১১
  • ৫:৫৭
  • ৭:১০
  • ৫:৪০