জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও স্কুলগুলোর দুরবস্থার প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স। গত শনিবার দেশটির রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে অন্তত সাড়ে ৫ লাখ মানুষ সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। এসময় বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। লিমোজ শহরের ঐতিহ্যবাহী সিটি হলসহ অনেক স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। লুটপাটও হয়েছে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। রবিবার (১৮ অক্টোবর) দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা নুনেজ জানিয়েছেন, বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনায় ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। খবর ফ্রান্স-২৪ এর।


বিবিসি বাংলাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, স্কুলের দুরবস্থা ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে শনিবার ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। প্যারিসে শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা পর্যন্ত দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
বিক্ষোভকারীরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর মধ্যে লিমোজ শহরের ঐতিহ্যবাহী সিটি হলও আগুনে পুড়ে গেছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি শহরে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। বিক্ষোভ থামাতে গিয়ে অন্তত দেড়শ পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু।


প্যারিসে শনিবার বিকালে বিক্ষোভকারীদের মূল মিছিলটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ বিবিসিকে বলেন, আমরা শান্তিবাদী এবং আমরা শুধু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি, কিন্তু কোনো কিছুই এগুচ্ছে না।
শনিবার বিক্ষোভ শুরুর পর সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় আগুন জ¦ালানো এবং গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে শহরের কেন্দ্রস্থলের বিখ্যাত স্থান প্লাস দ্য লা রিপাবলিকও রয়েছে। বিক্ষোভকারীরা দোকানপাট ভাঙচুর ও মালপত্র লুট করেন। প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে একদল বিক্ষোভকারীর সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এসময় পুলিশ কয়েকজনকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে দেখা গেছে।


লিয়ঁ শহরের মেয়র গ্রেগরি দুসেত শহরের পর্যটন দপ্তরের ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে একটি ট্র্যাজেডি বলে অভিহিত করেছেন। একটি টেলিভিশনকে তিনি বলেছেন, ‘এটি আমাদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে, কারণ এটি অত্যন্ত পরিচিত ও ঐতিহাসিক একটি ভবন।’


স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, আগুন নেভাতেও অগ্নিনির্বাপকদের বাধা দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। আগুনে লিমোজ শহরের সিটি হল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ভবনটির অনেক অংশ ধসে পড়েছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সাঁ-এতিয়েনের মেয়র রেজিস হুয়ানিকো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, সেখানে গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক তরুণের হাত উড়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, এমন ট্র্যাজেডি হওয়ার কথা নয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঞ্জে শহরে মুখোশপরা ব্যক্তিরা পরিকল্পিতভাবে সহিংস কর্মকা- চালিয়েছে। গ্রেনোবল, আভিনিয়ঁ, পো, মন্টপেলিয়ের, ভ্যালঁসহ বিভিন্ন স্থানে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্যারিসে পোশাক ও খাবারের দোকানে লুটপাট চালানো হয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের হাজার হাজার শিক্ষার্থী মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও কর্মীর সংকট এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছেন। দেশটিতে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের পড়াশোনার জন্য এসব মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। শনিবারের বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য এবং অন্যান্য প্রতিবাদী সংগঠনের লোকজন। এর মধ্যে রয়েছেন ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলনের সদস্যরা। ২০১৮ সাল থেকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন করে তারা ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদী আন্দোলনগুলোর একটিতে পরিণত করেন।


ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন দেশটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আগামী বছর দায়িত্ব ছাড়বেন। জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, আগামী এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উগ্র ডানপন্থী ন্যাশনাল র‌্যালি দলের নেতা মারিন লে পেন এবং উগ্র বামপন্থী দল লা ফ্রঁস আঁসুমিজের নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিতে পারে। মেলঁশোঁ চলমান বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। পরে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগ তুলেন। তবে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের নিন্দা জানিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু মেলঁশোঁর মন্তব্যকে বিপজ্জনক ও কপট আখ্যা দিয়ে বলেছেন, পুলিশ অত্যন্ত তীব্র মাত্রার সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, কিছু গোষ্ঠী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই বিক্ষোভকে ব্যবহার করছে। তবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউই সহিংসতার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি চাপিয়ে দিতে পারবে না।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, যারা ভাঙচুর করেছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট করেছে, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনায় আগুন দিয়েছে, তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *