দেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে আমানত, বিনিয়োগ ও প্রবাসী আয়সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে এসব ব্যাংকে আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা। একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৬ শতাংশের বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্ট শেষে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৫০ কোটি টাকা। জুলাই শেষে এই পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে আমানত বেড়েছে প্রায় শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ।

তবে গত বছরের আগস্টের তুলনায় আমানতের পরিমাণ ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ কম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে ১৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা

ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রেও ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট শেষে এসব ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। জুলাই শেষে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৮ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের আগস্টে বিনিয়োগ ছিল ৫ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে ১৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা।

দেশে বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার ব্যাংক রয়েছে ১০টি। এগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

এর মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।

আগস্ট শেষে এসব ব্যাংকের মোট কর্মীর সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ১২৪ জন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ১১৫ জন। ব্যাংকগুলোর মধ্যে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান তুলনামূলক ভালো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এক মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার

প্রবাসী আয় সংগ্রহেও ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৬২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ৫৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

ফলে এক মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা জুলাইয়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি।

বৈদেশিক বাণিজ্যে অবশ্য আমদানি ও রপ্তানিতে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। আগস্টে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আমদানি হয়েছে ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। জুলাইয়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। সে হিসাবে মাসিক আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আগের বছরের আগস্টের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।

অন্যদিকে, আগস্টে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছে ৫২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। জুলাইয়ে এর পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ডলার। ফলে এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে।

পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তর হতে চায় এনসিসি ব্যাংক

প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে বেসরকারি খাতের এনসিসি ব্যাংক। ব্যাংকটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরে আরও কয়েকটি শাখাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তর করার পাশাপাশি নতুন ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালু করা হবে।

ইতিমধ্যে ব্যাংকটির চারটি শাখা পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তর করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আগামী বছর পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তর হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে ব্যাংকটির।

এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নূরুন নেওয়াজ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আগামী বছরের মধ্যে রূপান্তরের লক্ষ্য বাস্তবায়নের আশা করছে ব্যাংকটি।

ব্যাংকটির রূপান্তরের পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে।

এর আগে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়ে নাম পরিবর্তন করে স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক হয়েছে। একইভাবে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক রাখা হয়।

৬২টি শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর আবেদন

এনসিসি ব্যাংক গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৬২টি প্রচলিত শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। পর্যায়ক্রমে এসব শাখাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে ব্যাংকটি।

ব্যাংকটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরও ৪০টি শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এনসিসি ব্যাংকের দেওয়া আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, তাদের ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমে মোট আমানত রয়েছে ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। বিনিয়োগের জন্য আরও ৮০০ কোটি টাকা ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকটি সুকুক বন্ডে ৪৪৮ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়াতেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক ফাইন্যান্সের (বিআইআইএফ) মাধ্যমে ৩৬৩ জন কর্মকর্তাকে ছয় দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অনলাইন ও সরাসরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। ভবিষ্যতে ব্যাংকের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এ প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *