সুনামগঞ্জের দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ অর্জন, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্যাতন, গায়েবি মামলা ও গ্রেফতার-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সুনামগঞ্জ শহরের শান্তিবাগ এলাকায় তাঁর নামে পাঁচতলা একটি বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি আমিনুলের দাবি, দায়িত্ব পালন নিয়ে অসন্তুষ্ট ব্যক্তিরাই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন।
পৌরসভার নথিতে পাঁচতলা বাড়ির তথ্য
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাসননগর এলাকার শান্তিবাগে ‘এ.আর.এস. মহল’ নামে পাঁচতলা একটি বাড়ি রয়েছে। বাড়িটির হোল্ডিং নম্বর ১৮১। পৌরসভার নথিতে বাড়িটির মালিক হিসেবে আমিনুল ইসলাম এবং তাঁর বাবা সিদ্দিকুর রহমানের নাম উল্লেখ রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত বাড়িটির পৌরকর পরিশোধের তথ্য রয়েছে। চলতি অর্থবছরের কর হিসেবে ৭ হাজার ৯১৪ টাকা পরিশোধের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটির জমির পরিমাণ আনুমানিক আট শতক। ওই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ১৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা বলে তাঁদের দাবি। জমিসহ বাড়িটির আনুমানিক মূল্য প্রায় সাত কোটি টাকা হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে এই মূল্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন স্থানে আমিনুল ইসলামের নামে-বেনামে অন্য সম্পদও রয়েছে। এসব সম্পদের উৎস ও বৈধতা সম্পর্কে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জে দায়িত্ব পালনের সময় বিএনপি, ছাত্রদল, জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নে ভূমিকা রেখেছিলেন আমিনুল ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা, রিমান্ডে নির্যাতন, বিনা পরোয়ানায় আটক এবং গ্রেফতারের পর অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া সুরমা ও ধোপাজান নদীতে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন এবং সংশ্লিষ্ট চাঁদাবাজিতে মদদ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন অভিযোগকারী। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেন বা তদন্তের ফলাফল প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সুনামগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক সাঈদ বলেন, অতীতে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমনে আমিনুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তাঁর কর্মকাণ্ড তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ছাত্রদল নেতাদের আটকের ঘটনায় অভিযোগ
জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. ফরহাদের অভিযোগ, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে একটি কর্মসূচি শেষে গন্তব্যে ফেরার সময় কয়েকজন ছাত্রদল নেতাকে আটক করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শান্তিবাগ এলাকায় একটি বাড়িতে অবস্থানের সময় পুলিশ অভিযান চালিয়ে জেলা ছাত্রদলের তৎকালীন আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম, সদস্যসচিব তারেক মিয়াসহ কয়েকজনকে আটক করে। আটকের পর তাঁদের মারধর ও নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ফরহাদ জানান, সেদিন তিনি পালিয়ে রক্ষা পান। জাহাঙ্গীর আলম ও তারেক মিয়াকে গ্রেফতারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছিল বলে তাঁর দাবি।
জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলমও অতীতের এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেছেন।
জামায়াত কার্যালয়ে ভাঙচুর ও গুলির অভিযোগ
জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরাও আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, ২০১৮ সালে সুনামগঞ্জের হাসননগরে জেলা জামায়াতের কার্যালয় হিসেবে পরিচিত ইসলামিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে দরজা-জানালা ভাঙচুর করা হয়। একই সময়ে উপাধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদ খান ও মমতাজুল হাসান আবেদের বাসায় অভিযান চালানোর সময়ও ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি বাসায় জেলা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি কুদরতে এলাহী মারুফকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি চালিয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে লন্ডনপ্রবাসী মারুফ দাবি করেন, ওই ঘটনায় আমিনুল ইসলাম নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সুনামগঞ্জ পৌর জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট আব্দুস সাত্তার মামুনের অভিযোগ, সাধারণ মানুষকে আটক করে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটত। তাঁর মতে, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কীভাবে পেলেন দিরাই থানার ওসির দায়িত্ব
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন তদবিরের মাধ্যমে আমিনুল ইসলাম দিরাই থানার ওসির দায়িত্ব পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের ২ জুলাই তিনি এ পদে যোগ দেন। থানার ওসি হিসেবে এটিই তাঁর প্রথম পদায়ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পদায়নের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুনামগঞ্জের ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা তাঁর অতীত কর্মকাণ্ডের তদন্ত এবং শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বাড়ির বিষয়ে যা বললেন ওসি
অভিযোগের বিষয়ে দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কেউ সন্তুষ্ট হন, আবার কেউ অসন্তুষ্ট হন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনে অসন্তুষ্ট ব্যক্তিরাই পরবর্তী সময়ে নানা অভিযোগ তুলতে পারেন।
শান্তিবাগে নিজের নামে পাঁচতলা বাড়ি থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। তবে তাঁর দাবি, ব্যাংকঋণ নিয়ে বাড়িটি নির্মাণ করেছেন এবং ঋণ এখনো পরিশোধ করছেন। কোন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাগজপত্র দেখে ব্যাংকের নাম জানাতে পারবেন।
পুলিশ সুপারের বক্তব্য
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ.বি.এম. জাকির হোসেন পিপিএম বলেন, থানায় ওসি পদায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তার যোগ্যতা এবং জুলাই আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা বিবেচনা করা হয়। এসব বিষয় বিবেচনা করেই আমিনুল ইসলামকে পদায়ন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে দমন-পীড়নের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণ থাকলে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা হবে। নির্যাতনের শিকার কেউ প্রমাণসহ অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ওসি আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা, তাঁর সম্পদের উৎস এবং অতীত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল এখনো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
