বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি: সিলেটের বিয়ানীবাজারে আলোচিত সাদিকুল ইসলাম রূপকের (২৭) রহস্যজনক মৃত্যুর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা—এ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি এখনো। গত ৩১ অক্টোবর এ ঘটনার পাঁচ মাস পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। দ্রুত তদন্ত শেষ করে মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।

গত ৩১ মে বিয়ানীবাজার পৌরসভার খাসাড়িপাড়া গ্রামে নিজ বাড়ির ড্রয়িংরুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় রূপকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাঁর দুই হাত পেছনে বাঁধা ছিল। এ ঘটনায় শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরিবারের সদস্যদের দাবি, সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় বাড়িতে রেখে যাওয়া রূপকের এমন মৃত্যু তাঁরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ঈদুল আজহার পরদিন রূপকের মা, স্ত্রী, বোন ও দুই শিশু সন্তান নানাবাড়ি কোনাগ্রামে বেড়াতে যান। এ সময় বাড়িতে একাই ছিলেন রূপক। পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁদের সঙ্গে যাওয়ার কথা থাকলেও রূপক সেদিন যাননি। পরদিন ৩১ মে বিকেলে পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ফিরে তাঁর কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে ঘরের ড্রয়িংরুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট ও রূপকের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চিরকুটে কয়েকজনের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের হিসাব লেখা ছিল। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পরদিন স্থানীয় মসজিদে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

মরদেহ উদ্ধারের সময় রূপকের দুই হাত পেছনে বাঁধা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকেই মৃত্যুর ঘটনাটি ঘিরে নানা প্রশ্ন সামনে আসে। দুই হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় কীভাবে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ পাওয়া গেল? মৃত্যুর আগে ও পরে কারা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন? মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণে কী পাওয়া গেছে? ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুটে লেখা আর্থিক লেনদেনের হিসাবের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

রূপকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে ভিড় করেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। মরদেহ উদ্ধারের সময়কার পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় অনেকের মধ্যেই মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। কেউ কেউ চেতনানাশক প্রয়োগ করে হত্যার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর আশঙ্কাও প্রকাশ করেন। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ফরেনসিক ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

রূপকের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনের দাবিতে শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ দাবিতে তাঁরা বিক্ষোভ ও থানা ঘেরাও কর্মসূচিও পালন করেন। পরে নিহতের মা রাবিয়া বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে বিয়ানীবাজার থানায় ৪/0৬/২৬ তারিখে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।যার মামলা নং,-০৬

প্রথমে মামলাটির তদন্ত শুরু করে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ। তবে দীর্ঘ সময়েও মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটিত না হওয়ায় একপর্যায়ে মামলার তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে হস্তান্তর করা হয়। গত ২ আগস্ট সিলেট পিবিআই নতুন করে তদন্ত শুরু করে। বিশেষায়িত এ তদন্ত সংস্থার ওপর পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও প্রত্যাশা ছিল, দ্রুতই বেরিয়ে আসবে রূপকের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য। কিন্তু তদন্ত শুরুর পর প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, ঘটনার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রতিবেদন না পাওয়ায় তদন্তের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে স্বজনদের মধ্যে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রূপকের পরিচিতজন ও আড্ডার সঙ্গীদের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এখনো কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

ভাইয়ের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন নিহতের যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বড় ভাই জহুরুল ইসলাম ইপক। তিনি বলেন, ‘আপন-পর বুঝি না। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আমার ভাইয়ের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন দেখতে চাই।’

নিহতের মা ও মামলার বাদী রাবিয়া বেগম বলেন, ‘আমার পুয়ারে (ছেলেকে) মারা অইছে (হত্যা করা হয়েছে)। বাড়িতে সুস্থ-স্বাভাবিক ছেলেকে রেখে গিয়েছিলাম, ফিরে তার মরা লাশ দেখলাম; আমি কিভাবে মানিয়া (মেনে) নিতাম? আমি তার হত্যাকারীদের পরিচয় জানতে চাই এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’

এ বিষয়ে পিবিআই সিলেটের উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল আহাদ বলেন, ‘গুরুত্বসহকারে তদন্ত চলছে। তবে এখনো আশানুরূপ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ভিসেরা ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’

এদিকে বাবাকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে রূপকের দুই শিশু সন্তান ওয়াসিয়া ইসলাম (৫) ও ওয়াজিয়া ইসলাম (১)। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত এই দুই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বজনরা। স্বামীকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান স্ত্রীও অপেক্ষায় রয়েছেন প্রিয়জনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার। পরিবারের প্রত্যাশা, আর দীর্ঘসূত্রতা নয়—দ্রুত তদন্ত শেষ করে রূপকের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন করা হবে এবং প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় এনে নিশ্চিত করা হবে ন্যায়বিচার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *