হোসাইন আহমদ সুজাদ: কয়েক দিন থেকে উপলব্ধি করলাম সিলেটে নতুন কোনো ডিসি, এসপি, পুলিশ কমিশনার কিংবা মন্ত্রী এলেই কিছু সাংবাদিককে দেখা যায় অনুষ্ঠান শুরুর আগেই প্রথম সারির চেয়ার দখল! মনে হয় সংবাদ সম্মেলন নয়, চেয়ার দখলের কোনো জাতীয় প্রতিযোগিতা চলছে।

তারপর কর্মকর্তার সঙ্গে ছবি একটা, দুইটা, তিনটা! এমনভাবে ছবি তোলা হয়, মনে হয় আজকের সবচেয়ে বড় সংবাদ: আমি কর্মকর্তার পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।

এরপর আসে প্রশ্ন করার পালা। কেউ কেউ এমন প্রশ্ন করেন, যার উত্তর শুনে মনে হয় এই তো, এখান থেকে তো দারুণ একটা নিউজ হতে পারে!

কিন্তু মজার বিষয় হলো, প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পর সেই সাংবাদিকের নিজের পত্রিকা বা টেলিভিশনে আর সেই নিউজ দেখা যায় না!

তখন প্রশ্ন জাগে ভাই, প্রশ্নটা করেছিলেন নিউজ করার জন্য, নাকি কর্মকর্তার মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার জন্য?
আরেক দল আছেন, মোবাইল হাতে পেলেই কর্মকর্তা কথা বলা শুরু করলেন, সঙ্গে সঙ্গে লাইভ অন! কর্মকর্তা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যা বললেন সবই লাইভ।
কিন্তু সাংবাদিকতা তো , মাইক অন করে দিলাম, এখন আপনার দায়িত্ব আপনি নিজেই সংবাদ খুঁজে নিন এমন কোনো পেশা নয়!

সব কথা সংবাদ নয়। সব বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাংবাদিকের কাজ হলো বক্তব্য শুনে মূল কথাটা বের করা, অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া, তথ্য যাচাই করা এবং প্রেক্ষাপটসহ সংবাদ তৈরি করা।
কিন্তু সেটা করতে হলে পড়তে হবে, শুনতে হবে, বুঝতে হবে, চিন্তা করতে হবে, বিশ্লেষণ করতে হবে। আর এখানেই আসল পরীক্ষা।

তাই সহজ রাস্তা, চেয়ার দখল করুন → ছবি তুলুন → দুটো প্রশ্ন করুন → লাইভ দিন → ফেসবুকে পোস্ট করুন → সাংবাদিকতা শেষ!

কিন্তু মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা, একটি বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করা, বক্তব্যের ভেতর থেকে সংবাদ বের করা, প্রয়োজনীয় অংশ সম্পাদনা করা এবং একটি শক্ত রিপোর্ট তৈরি করা এগুলোই সাংবাদিকতার আসল কাজ।
কারণ ছবি তোলা ক্যামেরাম্যানও পারেন, লাইভ চালু করা যে কেউ পারেন, প্রশ্ন করাও যে কেউ শিখে নিতে পারেন। কিন্তু কোন প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কোন উত্তরটি সংবাদ এবং কোন তথ্যটি মানুষের জানা দরকার, সেটা বুঝতে সাংবাদিক হতে হয়।

আর যারা প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়ার পর নিজেরাই সেই উত্তর নিয়ে নিউজ করেন না, তাদের জন্য একটাই প্রশ্ন,
আপনার প্রশ্ন যদি আপনার নিজের কাছেই নিউজ না হয়, তাহলে দর্শক-দর্শনীয় করে প্রশ্নটা করলেন কেন?
সাংবাদিকতা কোনো ‘চেয়ার-ছবি-প্রশ্ন-লাইভ’ কম্বো প্যাকেজ নয়।
চেয়ার দখল করা সহজ, ছবি তোলা সহজ,লাইভ দেওয়া সহজ।

প্রশ্ন করাও সহজ, কঠিন হলো, সঠিক তথ্য খুঁজে বের করে সেটাকে সংবাদ বানানো।
আর শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকের পরিচয় সে কার পাশে বসেছে, কার সঙ্গে ছবি তুলেছে কিংবা কতক্ষণ লাইভ করেছে, সেটাতে নয়; সে কী সংবাদ দিয়েছে, সেটাতেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *