সিলেটসহ সারা দেশে ব্যাটারি রিকশা এখন শুধু একটি বাহন নয়, এটি লাখ লাখ পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। এই বাহনটিকে ঘিরে যে বিদ্যুৎ অপচয়ের অপপ্রচার চালানো হয়, বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
একটি ব্যাটারি রিকশা ফুল চার্জ হতে মাত্র এক থেকে দেড় ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে, যার দাম মাত্র দশ থেকে পনেরো টাকা। এই পনেরো টাকার বিদ্যুৎ দিয়ে একটি রিকশা সত্তর থেকে নব্বই কিলোমিটার চলে এবং একজন চালক দিনে আটশ থেকে এক হাজার টাকা আয় করেন। অর্থাৎ পনেরো টাকার বিদ্যুৎ এক হাজার টাকার অর্থনীতি তৈরি করছে। এটা অপচয় নয়, এটা বর্তমানে বিদ্যুতের সবচেয়ে ভালো সদ্ব্যবহার ও সুবিনিয়োগ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মসংস্থান। দেশে বর্তমানে প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লাখ মানুষ সরাসরি ব্যাটারি রিকশার উপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে চালক, গ্যারেজ মালিক, মেকানিক, ব্যাটারি ব্যবসায়ী ও চার্জিং কর্মী রয়েছেন। একজন অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত মানুষ, যে আগে দিনমজুরি করতো, সে এখন একটি রিকশা চালিয়ে তার পরিবারকে সম্মানের সাথে চালাতে পারছে। তার ছেলে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। এই বাহনটি গ্রামের বেকার যুবকদের শহরে এসে চাঁদাবাজি বা মাদকের দিকে না গিয়ে একটি সৎ পেশায় থাকার সুযোগ করে দিয়েছে।
যদি হঠাৎ করে এই রিকশা নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে কী হবে? এক রাতের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে যাবে। সিলেটের মতো শহরে অন্তত পঞ্চাশ হাজার পরিবার সরাসরি পথে বসে যাবে। এই বিশাল বেকার জনগোষ্ঠী তখন কী করবে? অপরাধ বাড়বে, চুরি ছিনতাই বাড়বে, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবে। সরকারকে তখন বেকার ভাতা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, যা এই পনেরো টাকার বিদ্যুতের চেয়ে হাজার গুণ বেশি ব্যয়বহুল।
তাই ব্যাটারি রিকশা বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। একটি পেট্রোলের অটো যেখানে একই পথে তিনশ থেকে চারশ টাকার জ্বালানি পোড়ায় যা বিদেশ থেকে ডলার দিয়ে কিনতে হয়, সেখানে ব্যাটারি রিকশার বিদ্যুৎ দেশেই তৈরি হয়, দেশের টাকা দেশেই থাকে। এতে ধোঁয়া নেই, শব্দ নেই। প্রয়োজন শুধু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। অবৈধ চার্জিং বন্ধ করে বৈধ সোলার চার্জিং স্টেশন, লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও উন্নত ব্রেকের ব্যবস্থা করলে এই রিকশাই হবে বেকারত্ব দূর করার, বিদ্যুতের সদ্ব্যবহারের এবং পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সর্বোপরি, স্বল্প ব্যয়ে যাত্রীদের চলাচলের অত্যন্ত উপযোগী একটি বাহন, যা দুর্ঘটনাপ্রবণ বলে অপপ্রচার ও নিষিদ্ধ না করে আরো টেকসই ও নিরাপদ করে তৈরি করা সম্ভব।



