কেন গরমে শরীর এত ক্লান্ত হয়ে পড়ে?

গরমে বাইরে বের হলে ঘাম, ক্লান্তি কিংবা পানিশূন্যতাকে অনেকেই স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখেন। কিন্তু, অতিরিক্ত তাপ শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করে। এতে শুধু সাময়িক অস্বস্তি নয়, হৃদযন্ত্র, কিডনি, শ্বাসতন্ত্র ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বাড়তে পারে চাপ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, তীব্র গরমের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য হলেও এ বিষয়ে মানুষের সচেতনতা এখনও যথেষ্ট নয়।

বাড়ছে তীব্র গরমের ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিরিক্ত গরম ও তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়ছে। একইসঙ্গে, এসব তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্রও হচ্ছে। অস্বাভাবিক গরমের দিন ও রাত একটানা চলতে থাকলে শরীরে ক্রমাগত চাপ তৈরি হয়। এতে অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০০৪ সালের তুলনায় ২০১৭ থেকে ২০২১ সময়ে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের তাপজনিত মৃত্যুহার প্রায় ৮৫ শতাংশ বেড়েছে।

২০০০ থেকে ২০১৯ সালের বিভিন্ন গবেষণার হিসাব বলছে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৪ লাখ ৮৯ হাজার মানুষ তাপজনিত কারণে মারা যান। এর ৪৫ শতাংশ মৃত্যু এশিয়ায় এবং ৩৬ শতাংশ ইউরোপে ঘটে।

তাপের প্রভাব অবশ্য সবার ওপর সমান নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা, পেশা এবং আর্থসামাজিক পরিস্থিতির মতো বিষয় একজন মানুষের তাপের ঝুঁকি কতটা হবে, তা নির্ধারণ করে।

কেন গরমে শরীর এত ক্লান্ত হয়ে পড়ে?

শরীরের ভেতরে বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত তাপ তৈরি হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় শরীর ঘামসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত তাপ বের করে নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু বাইরে তাপমাত্রা বেশি, বাতাসে আর্দ্রতা বেশি, বাতাসের চলাচল কম কিংবা সূর্যের তাপ তীব্র হলে শরীরের জন্য অতিরিক্ত তাপ বের করে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে গরম পোশাক বা শরীর ঢেকে রাখা পোশাকও তাপ বের হওয়ার পথে বাধা তৈরি করতে পারে। ফলে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে আরো বেশি চাপের মধ্যে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে হৃদ্‌যন্ত্র ও কিডনির ওপরও। অতিরিক্ত গরমে হিট এক্সহশন বা তাপজনিত ক্লান্তি এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। একইসঙ্গে, আগে থেকে থাকা হৃদরোগ, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, ডায়াবেটিস বা মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাও আরো খারাপ হতে পারে। এমনকি তীব্র গরমে কিডনিতে হঠাৎ ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

অফিসে বা বাইরে কাজ করেন যারা, ঝুঁকি বেশি

যারা দিনের বড় সময় বাইরে কাজ করেন, শারীরিক শ্রম দেন বা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাদের শরীরে অতিরিক্ত তাপ জমার ঝুঁকি বেশি। ক্রীড়াবিদ এবং জরুরি সেবার কর্মীরাও এ ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।

গরমে শহরের নিম্নআয়ের মানুষও তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। নিম্নমানের আবাসন, পর্যাপ্ত ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা না থাকা এবং তাপ থেকে সুরক্ষার সীমিত সুযোগ এর অন্যতম কারণ।

শহরের ভবন নির্মাণের ধরনও গরমের প্রভাব বাড়াতে পারে। পর্যাপ্ত সবুজ জায়গার অভাব এবং এমন কিছু নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার, যা বেশি তাপ ধরে রাখে, শহরে মানুষের ওপর অতিরিক্ত তাপের চাপ বাড়াতে পারে।

গরমে বাইরে বের হলে কী করবেন?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে বাইরে যাওয়া ও অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা ভালো। সম্ভব হলে ছায়ায় থাকতে হবে। সরাসরি রোদে অনুভূত তাপমাত্রা ছায়ার তুলনায় ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি মনে হতে পারে।

দিনের মধ্যে দুই থেকে তিন ঘণ্টা তুলনামূলক ঠান্ডা জায়গায় কাটানোও শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। তাপপ্রবাহের সময় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া সতর্কবার্তার দিকেও নজর রাখতে হবে।

গরমের মধ্যে শরীরচর্চা করলে সময় ও পরিশ্রমের মাত্রা নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে। দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে ভারী ব্যায়াম বা কায়িক শ্রম না করাই ভালো।

ঘর ঠান্ডা রাখবেন যেভাবে

বাইরের তাপমাত্রা কমে গেলে, বিশেষ করে রাতে, জানালা খুলে ঘরের ভেতরে বাতাস চলাচলের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে দিনের বেলায় বাইরের তাপমাত্রা ঘরের তুলনায় বেশি হলে জানালা বন্ধ রেখে পর্দা বা ব্লাইন্ড দিয়ে সরাসরি সূর্যের আলো আটকানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রও বন্ধ রাখা ভালো, কারণ এগুলো ঘরের ভেতরে বাড়তি তাপ তৈরি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকলে বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে গেলে পাখা শরীরকে ঠান্ডা করার বদলে উল্টো গরম করে দিতে পারে।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করলে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তাপমাত্রা সেট করে সঙ্গে বৈদ্যুতিক পাখা চালানো যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এতে ঘর প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের বিদ্যুৎ খরচও কমানো সম্ভব।

পানি খাবেন নিয়মিত

গরমে শরীর ঠান্ডা রাখা ও পানিশূন্যতা এড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিয়মিত পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছে। সাধারণভাবে প্রতি ঘণ্টায় এক কাপ পানি এবং দিনে অন্তত ২ থেকে ৩ লিটার পানি পান করার কথা বলা হয়েছে।

তবে, ব্যক্তিভেদে পানির প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে যাদের হৃদযন্ত্র, ফুসফুস বা কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি গ্রহণ করা উচিত।

গরমে ঢিলেঢালা ও হালকা পোশাক পরা, ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করা এবং ভেজা কাপড় বা পানি স্প্রে করে ত্বক ঠান্ডা রাখাও কাজে আসতে পারে।

শুধু নিজের নয়, খোঁজ নিন অন্যদেরও

গরমে ৬৫ বছরের বেশি বয়সি মানুষ এবং হৃদ্‌যন্ত্র, ফুসফুস বা কিডনির সমস্যায় থাকা ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও একা বসবাসকারীদেরও নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বিশেষ করে তাপপ্রবাহের সময় পরিবারের বয়স্ক সদস্য বা অসুস্থ স্বজন পর্যাপ্ত পানি পান করছেন কি না, অতিরিক্ত গরমে থাকছেন কি না; এসব বিষয়ে নজর রাখা জরুরি।

শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা

গরমের দিনে শিশুদের সরাসরি রোদে রাখা এড়িয়ে চলতে হবে। দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে তাদের ছায়ায় বা ঘরের ভেতরে রাখাই নিরাপদ।

কোনো অবস্থাতেই শিশু বা প্রাণীকে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে রেখে যাওয়া যাবে না। অল্প সময়ের মধ্যেই গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে।

শিশুকে হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরানো, প্রয়োজন অনুযায়ী টুপি, সানগ্লাস ও সানস্ক্রিন ব্যবহার করাও উপকারী। শিশুর স্ট্রলার বা প্র্যাম শুকনো কাপড় দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে রাখা উচিত নয়। এতে ভেতরে তাপ আরও বেড়ে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ, প্রয়োজন হলে পাতলা ভেজা কাপড় ব্যবহার করে তা বারবার ভিজিয়ে রাখা যেতে পারে এবং সঙ্গে বহনযোগ্য পাখা ব্যবহার করা যেতে পারে।

তীব্র গরমে কাজের সক্ষমতাও কমে

অতিরিক্ত গরম শুধু শরীরের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে না, দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। খুব গরম আবহাওয়ায় কাজ বা পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে। এতে কর্মক্ষমতা কমে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।

তীব্র তাপপ্রবাহের সময় স্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার প্রয়োজনও তৈরি হতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহ, পরিবহন ও পানির অবকাঠামোতে সমস্যা হলে স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হতে পারে।

তাপজনিত অসুস্থতা বা মৃত্যুর ঘটনা অনেক সময় তীব্র গরমের দিনেই কিংবা তার পরের কয়েক দিনের মধ্যে ঘটে। তাই তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

গরমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও জরুরি

গরমের প্রভাব কতটা হবে, তা শুধু তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে না। কতক্ষণ ধরে গরম থাকছে, কতটা তীব্র, স্থানীয় মানুষ ওই আবহাওয়ার সঙ্গে কতটা অভ্যস্ত এবং ঘরবাড়ি ও অন্যান্য অবকাঠামো কতটা উপযোগী—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, তাপজনিত অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকি আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব এবং যথাযথ প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা নিলে এর বড় অংশ প্রতিরোধ করা যায়। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে পরিবার, কর্মক্ষেত্র, প্রতিষ্ঠান ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ অতিরিক্ত গরমে জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:৩৩
  • ১১:৪৪
  • ৩:৫৬
  • ৫:৩৮
  • ৬:৫১
  • ৫:৪৫