নবজাগরণের অগ্রদূত মুনশী মেহেরুল্লাহ, বন্ধ তাঁর নামে রেলস্টেশন

জাতীয় ডেস্ক | Amar Sylhet

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ধর্মীয় কুসংস্কার ও সামাজিক বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে যুক্তি, বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে ভূমিকা রেখেছিলেন মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ। ধর্মচিন্তক ও সমাজসংস্কারক হিসেবে পরিচিত এই মনীষীর নামে যশোরের চূড়ামনকাটি ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত মেহেরুল্লাহ নগর রেলস্টেশনটি ২০০৬ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা।

স্টেশনটি পুনরায় চালুর দাবিতে চলতি বছরের আগস্টে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি, রেল যোগাযোগ চালুর পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তকে মুনশী মেহেরুল্লাহর জীবন ও অবদান অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

যুক্তি ও লেখনীর মাধ্যমে পরিচিতি

মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ১৮৬১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৎকালীন যশোর জেলার কালীগঞ্জ থানার ঘোপ গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। এলাকাটি বর্তমানে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। তাঁর পৈতৃক বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। যশোরের মৌলভি মোসহারউদ্দীনের কাছে ধর্মশিক্ষা এবং মৌলভি মুহাম্মদ ইসমাইলের কাছে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষা-সাহিত্য শেখেন। কোরআন-হাদিস ও ফারসি সাহিত্যেও জ্ঞান অর্জন করেন। তবে দারিদ্র্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করা সম্ভব হয়নি। কিছুদিন সরকারি চাকরি করার পর দরজিবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নিয়ে যশোরে দোকান খোলেন।

সে সময় খ্রিষ্টান পাদরিদের ইসলাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে প্রচারণার প্রতিবাদে বক্তৃতা ও লেখালেখি শুরু করেন তিনি। ধর্মীয় বিষয়ে পাদরিদের সঙ্গে একাধিকবার প্রকাশ্য বিতর্কেও অংশ নেন। যুক্তিনির্ভর বক্তব্য ও লেখনীর কারণে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘খৃষ্টীয় ধর্মের অসারতা’, ‘মেহেরুল ইসলাম’, ‘খৃষ্টান মুসলমান তর্ক-যুদ্ধ’, ‘বিধবা গঞ্জনা’, ‘হিন্দুধর্ম রহস্য’, ‘রদ্দে খ্রিষ্টান ও দলিলোল ইসলাম’, ‘ইসলামী বক্তৃতামালা’ এবং ‘নবরত্নমালা বা বাংলা গজল’। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯০৭ সালের ৮ জুন ৪৬ বছর বয়সে তিনি মারা যান। ছাতিয়ানতলা গ্রামে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে রেলস্টেশন

মেহেরুল্লাহ নগর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনমাস্টারের কক্ষ ও টিকিট কাউন্টার তালাবদ্ধ। টিনের ছাউনির বড় অংশ ভেঙে পড়েছে। সিগন্যাল টাওয়ারের দোতলা ভবনও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

স্টেশনটিতে পাশাপাশি দুটি রেললাইন থাকলেও একটি সচল। ওই লাইন দিয়ে খুলনা-রাজশাহী, ঈশ্বরদী ও ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল করে।

স্থানীয় বাসিন্দা ৯৫ বছর বয়সী আবুল খায়ের জানান, চাকরির প্রয়োজনে ১৯৬০ সাল থেকে খুলনা-যশোর রুটে যাতায়াত করেছেন। এই স্টেশন থেকেই বহুবার ট্রেনে উঠেছেন এবং নেমেছেন।

স্থানীয় কৃষক মতিয়ার রহমান বলেন, ২০০০ সালের আগে স্টেশনটিতে সব ধরনের ট্রেন থামত। তখন স্টেশনটি বেশ জমজমাট ছিল এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে কেন এটি বন্ধ হয়ে যায়, তা তিনি জানেন না।

যশোর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশনমাস্টার মো. সাইফুজ্জামান জানান, মেহেরুল্লাহ নগর রেলস্টেশনটি ২০০৬ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে।

ভোগান্তিতে শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা

খুলনার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী প্রাপ্তি খাতুন বলেন, বাড়ি থেকে বাসে খুলনায় যাতায়াত করতে তাঁকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। ভাঙা সড়ক, যানজট, দীর্ঘ অপেক্ষা ও বাড়তি খরচ দুর্ভোগ বাড়ায়। স্টেশনটি চালু হলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হবে।

সবজি উৎপাদক ও ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান, তিনি আরও ১০ থেকে ১২ জনের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন মিনি ট্রাকে করে খুলনায় সবজি পাঠান। সড়কপথে পরিবহণ ব্যয় বেশি এবং নানা ঝামেলা রয়েছে। সময়মতো গন্তব্যে সবজি পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে। স্টেশনটি চালু হলে কম খরচে দ্রুত সবজি পরিবহণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

চূড়ামনকাটি বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, বাজারে প্রায় ২০০ কাপড় ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাঁরা নিয়মিত কুষ্টিয়ার পোড়াদহ থেকে কাপড় আনেন। ট্রাকে পণ্য পরিবহণে খরচ বেশি হয়। রেল যোগাযোগ চালু থাকলে একই দিনে পোড়াদহ থেকে মালামাল আনা সম্ভব হতো।

স্টেশন চালুর দাবিতে আন্দোলন

মেহেরুল্লাহ নগর রেলস্টেশন চালুর দাবিতে চলতি বছরের আগস্টে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।

আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক এবং ছাতিয়ানতলা-চূড়ামনকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. শিমুল হোসেন বলেন, যশোর সদর ও চৌগাছা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের প্রায় চার লাখ মানুষ এই স্টেশনের সুবিধা পেতে পারেন। এলাকাটির মধ্যবর্তী স্থানে স্টেশনটির অবস্থান। কাছেই রয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)। এ অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী রাজশাহী ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পাশাপাশি এখানকার উৎপাদিত সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এসব কারণে স্টেশনটি চালু করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, স্টেশনটি এ অঞ্চলের মনীষী মুনশী মেহেরুল্লাহর নামে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেও স্টেশনটির কার্যক্রম চালু রাখা উচিত। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তাঁর অবদান সম্পর্কে জানে না। তাই পাঠ্যক্রমে তাঁর জীবন ও কর্ম অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

মুনশী মেহেরুল্লাহর চতুর্থ প্রজন্মের সদস্য অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মেহের মহব্বত হোসেন বলেন, স্টেশনটি চালু করা এখন সময়ের দাবি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যবিপ্রবিতে শিক্ষার্থীরা যাতায়াত করেন। যশোর রেলস্টেশন থেকে ক্যাম্পাসে যেতে তাঁদের ভোগান্তি হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরকারি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তাঁর জানা মতে, স্টেশনটি পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া এগিয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী (পাকশী) গৌতম বিশ্বাস বলেন, শুধু মেহেরুল্লাহ নগর নয়, বন্ধ থাকা অন্যান্য স্টেশনও চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মেহেরুল্লাহ নগর স্টেশনে লেভেল ক্রসিংয়ের জন্য ইতোমধ্যে কিছু স্লিপার ফেলা হয়েছে। বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ এবং এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *