
সুনামগঞ্জের ছাতকের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে দুই দফা ভয়াবহ বিস্ফোরণের (ব্লো-আউট) ২০ বছর পর আবারও গ্যাস অনুসন্ধানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে আইনি জটিলতা নিষ্পত্তি হওয়ার পর এবার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্সকে দিয়ে নতুন করে অনুসন্ধানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেট্রোবাংলা।
২০০৫ সালে কানাডীয় কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেসের অদক্ষতায় টেংরাটিলায় জানুয়ারি ও জুন মাসে দুই দফা বিস্ফোরণ ঘটে। এতে প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত ইকসিড (ICSID) নাইকোকে ৪২ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দেয়। এই রায়ের মাধ্যমেই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা দূর হয় এবং নতুন করে কাজ শুরুর পথ প্রশস্ত হয়।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, টেংরাটিলায় প্রাথমিকভাবে দুটি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বাপেক্স উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ শুরু করেছে। সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে আগামী বছরই (২০২৬) মাঠে নামবে খননযন্ত্র।
উল্লেখ্য, টেংরাটিলা মূলত সিলেট গ্যাসফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) আওতাধীন। তবে পেট্রোবাংলার সিদ্ধান্তে এখানে খনন কাজ করবে বাপেক্স। উত্তোলিত গ্যাসের মুনাফা এই দুই কোম্পানির মধ্যে কীভাবে বণ্টন হবে, তা নির্ধারণে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, দুর্ঘটনার পরও টেংরাটিলার ভূ-গর্ভে বড় ধরনের মজুত অবশিষ্ট রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী এখানে ১০টি স্তরে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ছাতক পশ্চিম জোনে (টেংরাটিলা) অন্তত ৪০০ বিসিএফ গ্যাসের মজুত থাকতে পারে। তবে পুরো ছাতক ক্ষেত্র (পূর্ব ও পশ্চিম) মিলিয়ে ২ থেকে ৩ টিসিএফ গ্যাস রিসোর্স থাকার সম্ভাবনা দেখছে এসজিএফএল।
ছাতক পশ্চিম জোন থেকে একটি কূপে অতীতে গ্যাস উত্তোলন হয়েছে। সেখান থেকে ২৭ বিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। সেই গ্যাস সরবরাহ করা হয় ছাতক সিমেন্ট কারখানায়। এই গ্যাসফিল্ড ১৯৮৪ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের পূর্ব জোনটি এখনও কোনো অনুসন্ধান হয়নি। তবে পশ্চিম জোনে গ্যাসের মজুত বলছে পূর্ব জোনেও গ্যাসের ভাণ্ডার রয়েছে।
বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ ড. বদরুল ইমাম বলেন, “বিস্ফোরণের কারণে এখানে উন্নয়ন কাজ বন্ধ ছিল। কিন্তু এখানে ভালো মজুত আছে বলেই আমাদের ধারণা। তাই নতুন করে কূপ খননের পরিকল্পনাটি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী।”
দেশে গ্যাসের মজুত যে হারে কমছে। বাংলাদেশে পেট্রোবাংলার সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে ৩০টিসিএফ গ্যাসের প্রমাণিত মজুত ছিল। এরমধ্যে প্রায় ২৩ টিসিএফ উত্তোলন হয়েছে এবং এখন সাত টিসিএফ এর মতো অবশিষ্ট আছে। বর্তমান মজুত আগামী ১০ বছরের মধ্যে ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় প্রচলিত সুরমা বেসিনের নিচে ‘বরাইল স্ট্রাকচার’ বা গভীর স্তরে অনুসন্ধানের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর অংশ হিসেবে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দেশের গভীরতম কূপ (৫,৬০০ মিটার) খনন শুরু হয়েছে। টেংরাটিলাতেও প্রয়োজনে এমন গভীর অনুসন্ধান চালানো হতে পারে।
বাপেক্সের কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় সুযোগ। বাপেক্সের ৫টি রিগ থাকলেও দক্ষ জনবল সংকটে সবগুলো একসাথে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া ৫ হাজার মিটারের বেশি গভীর খননে বিদেশি কারিগরি সহায়তা বা আধুনিক সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন ড. বদরুল ইমাম।
এক কার্গো এলএনজি আমদানির খরচ দিয়ে বাপেক্স অন্তত ৮টি কূপ খনন করতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও ডলার সাশ্রয়ে টেংরাটিলার মতো পরিত্যক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেত্রগুলোতে পুনরায় অনুসন্ধান চালানোকে সময়ের সবচেয়ে লাভজনক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা।
বিবিসির প্রতিবেদন অবলম্বনে