
এক্সেলসিয়র রিসোর্ট
প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা সিলেটের আলোচিত রিসোর্ট প্রকল্প ‘এক্সেলসিয়র সিলেট’ এখন দখল, নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রায় এক যুগ আগে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্প বর্তমানে নানা বিরোধ ও প্রভাব বিস্তারের ঘটনায় আলোচনায় এসেছে।
২০১১-১২ সালের দিকে যুক্তরাজ্য প্রবাসী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক আহমদ আলীর নেতৃত্বে কয়েকজন প্রবাসী উদ্যোক্তা সিলেটে একটি আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট ও হোটেল নির্মাণের উদ্যোগ নেন। প্রথমে নগরীর পাঠানটুলা এলাকায় প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সে সময় নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, যুক্তরাজ্যের এমপি আল মিনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পরে শাহপরান থানাধীন দলইপাড়ায় ১৭ একর জায়গার ওপর নির্মিত ‘জাকারিয়া সিটি’ প্রকল্পটি প্রায় ৩২ কোটি টাকায় ক্রয় করেন কয়েকজন প্রবাসী বিনিয়োগকারী। একইসঙ্গে প্রকল্পের ব্যাংক ঋণের দায়ও নিজেদের প্রতিষ্ঠানের আওতায় নেন তারা।
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন রিসোর্ট গড়ে তুলতে ব্রিটিশ আর্কিটেক্ট সায়মন মিয়াকে বাংলাদেশে এনে একটি তিন তারকা মানের রিসোর্টের ডিজাইন প্রস্তুত করা হয়। জানা যায়, সায়মন মিয়া লন্ডন অলিম্পিকের ডিজাইনার দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
এরপর ১৯ জন পরিচালক মিলে ‘এক্সেলসিয়র সিলেট’ নামে কোম্পানি গঠন করা হয় এবং কোম্পানির নামে জমি রেজিস্ট্রি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করা হয়। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পান আহমদ আলী।
প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা জানান, তাদের লক্ষ্য ছিল সিলেট অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন ও আবাসন সুবিধা গড়ে তুলে দেশের পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করা। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পটি রাজনৈতিক প্রভাব ও দখল-নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে জড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রিসোর্টটির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তৎকালীন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আনোয়ারুজ্জামানের প্রভাব ব্যবহার করে পান্না নামের এক ব্যক্তির হাতে প্রকল্পটির দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়।
বর্তমানে পান্না কারাগারে থাকলেও তার চাচাতো ভাই বিলাল রিসোর্ট-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে অসামাজিক কর্মকাণ্ড, মাদক, জুয়া ও অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতিতে নতুন মোড় নেয়। আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যক্তি এলাকা ত্যাগ করলে কিছু সময়ের জন্য রিসোর্টটির দায়িত্ব নেন নুরুল হুদা। পরে স্থানীয় বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার সমর্থনে তাকেও সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের দাবি, পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি একত্রিত হয়ে আবারও রিসোর্টটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। ফলে প্রকৃত মালিকপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিনিয়োগ ও সম্পত্তি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত এবং তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, যথাযথ প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে “এক্সেলসিয়র সিলেট” পুনরায় একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।