
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন আমরা অতীতের দিকে তাকাই, তখন শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসের এক বিশাল পালাবদল আমাদের চোখে পড়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের চূড়ান্ত পতন ঘটে। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রের ক্রান্তিকালীন দায়িত্ব পালন করে। সেই অন্তর্বর্তীকালীন পর্বের সমাপ্তির পর জনগণের ভোটাধিকার ও ম্যান্ডেট নিয়ে বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছে। কিন্তু আজকের এই পরিবর্তিত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের স্বাধীনতায় শ্বাস নেওয়ার আগে, দেশের সাংবাদিক সমাজকে শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকে যে ভয়াবহ, বিভীষিকাময় ও দমবন্ধ করা পরিস্থিতি পার করতে হয়েছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যম ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে সাংবাদিকতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ধারণাটিকে সুপরিকল্পিতভাবে পদদলিত করা হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়ে দৃশ্যত দেশে টেলিভিশন চ্যানেল ও পত্রিকার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে একটি ‘মিডিয়া বুম’ বা সম্প্রসারণের মায়াজাল তৈরি হলেও, প্রকৃত সাংবাদিকতা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে সরকারের জনসংযোগ হাতিয়ারে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছিল।
শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার যে চরম অবনতি ঘটেছিল, তার সবচেয়ে বড় ও বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ হলো প্যারিস-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ (RSF)-এর প্রকাশিত বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচক। ২০০৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন ১৮০টি দেশের মধ্যে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২১তম । কিন্তু সরকারের লাগামহীন দমন-পীড়ন এবং ভয়ের সংস্কৃতির কারণে এই সূচকে বাংলাদেশের ধারাবাহিক ও লজ্জাজনক পতন ঘটতে থাকে। সূচকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশ ১৫২তম অবস্থানে নেমে আসে । ২০২২ সালে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করে এবং এক ধাক্কায় ১০ ধাপ পিছিয়ে অবস্থান দাঁড়ায় ১৬২তম । ২০২৪ সালের সর্বশেষ প্রকাশিত সূচকে বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে ১৬৫তম অবস্থানে পতিত হয় । মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে সূচকে ৪৪ ধাপের এই ভয়াবহ পতন প্রমাণ করে যে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মাপকাঠিতে বাংলাদেশ কীভাবে সুপরিকল্পিতভাবে পিছিয়ে পড়েছিল । আরএসএফ তাদের বিশ্লেষণে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিল যে, শেখ হাসিনার সরকার মিডিয়াকে স্বাধীন সত্তার পরিবর্তে জনসংযোগের হাতিয়ার ভাবত এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পথে সেন্সরশিপ, সাইবার হয়রানি ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরাসরি হস্তক্ষেপের মতো পদ্ধতিগত বাধা সৃষ্টি করেছিল ।
শেখ হাসিনা সরকার সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে চতুর যে কৌশলটি গ্রহণ করেছিল, তা হলো ‘স্বজনতোষী পুঁজিবাদ’ (Crony Capitalism)-এর মাধ্যমে সম্প্রচার মাধ্যমের মালিকানার চরম রাজনীতিকীকরণ। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পরপরই আওয়ামী লীগ সরকার সুপরিকল্পিতভাবে কেবল দলীয় অনুগত এবং আশীর্বাদপুষ্ট ব্যবসায়ীদের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদান শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৯ সালের অক্টোবরে মাত্র একদিনেই ১০টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ২০১০ ও ২০১১ সালে আরও বেশ কিছু দলীয় চ্যানেল অনুমোদন লাভ করে । এই রাজনৈতিক লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ও আদর্শিক আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং জনগণের সম্মতি উৎপাদন করা । মালিকানার এই চরম রাজনীতিকীকরণের ফলে সংবাদমাধ্যমগুলো ক্রমশ সরকারের অঘোষিত মুখপাত্রে পরিণত হয় এবং নিউজরুমগুলোতে এক ধরনের ‘স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ’ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
নিজেদের অনুগত গণমাধ্যমের প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি শেখ হাসিনা সরকার অত্যন্ত নির্দয়ভাবে বিরোধী মতাদর্শের বা সরকারের সমালোচক গণমাধ্যমগুলোকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ভিন্নমত দমনের এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয় ২০১০ সালে, যখন পূর্ববর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠিত স্যাটেলাইট চ্যানেল ‘চ্যানেল ওয়ান’-এর সম্প্রচার জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয় । দীর্ঘ ১৬ বছর পর কেবল আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরই চ্যানেলটি পুনরায় সম্প্রচারে ফিরতে সক্ষম হয় । সরকারের রোষানলের অন্যতম শিকার ছিল ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকা। পত্রিকাটির সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ২০১০ এবং ২০১৩ সালে দুই দফা গ্রেপ্তার করা হয় এবং উভয় সময়েই পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিশেষ করে ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতির স্কাইপ কথোপকথন প্রকাশের জেরে পত্রিকাটির প্রকাশনা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয় সরকার। একই বছর, ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের সংবাদ সম্প্রচারের সময় উসকানিমূলক সংবাদ পরিবেশনের অভিযোগ এনে ‘দিগন্ত টেলিভিশন’ এবং ‘ইসলামিক টিভি’-র সম্প্রচারও বন্ধ করে দেওয়া হয় । বাংলাদেশের বিখ্যাত সাংবাদিক ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর উপর চলতে থাকে সরকারের নানা চাপ ও অত্যাচার। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার তিনদিন আগে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এর আগে তাকে ৮ মাস দেশে ফিরতে দেয়া হয়নি। গণমাধ্যম দমনের এই নগ্ন ধারা সরকারের শেষ দিক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মুখপত্র হিসেবে পরিচিত তিন দশকের পুরোনো ব্রডশিট সংবাদপত্র ‘দৈনিক দিনকাল’-এর প্রকাশনা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রকাশকের পদে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আইনি অবস্থাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, যা দেশে ও বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় । যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিশনের সদস্য রাষ্ট্রগুলো এই পদক্ষেপকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।
সাংবাদিকদের আইনিভাবে শায়েস্তা করতে এবং সমাজ থেকে ভিন্নমতকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলতে শেখ হাসিনা সরকার যে আইনি হাতিয়ারটিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে, তা হলো ২০১৮ সালে প্রণীত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ (DSA)। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সুরক্ষা অধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, এই আইনটি ছিল বিশ্বের অন্যতম নিবর্তনমূলক আইন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (CGS)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে অন্তত ৪৫১টি ঘটনায় সাংবাদিকদের অপরাধী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং এর মধ্যে ৯৭ জন সাংবাদিককে সরাসরি গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ)-এর তথ্যমতে, গ্রেপ্তারকৃত সাংবাদিকদের ওপর এক ধরনের সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাস চালানো হতো। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২৭ জন গ্রেপ্তারকৃত সাংবাদিকের মধ্যে প্রায় অর্ধেককেই (১২ জন) গভীর রাতে বা ভোরবেলা সাদাপোশাকের পুলিশ তুলে নিয়ে যায় । অনেক ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের জন্য ৩০-৪০ জন পুলিশ সদস্যের বিশাল বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল এবং গ্রেপ্তারকৃতদের পরিবারকে তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানানো হতো না। নির্বাচনের আগে প্রবল চাপের মুখে সরকার আইনটির নাম পরিবর্তন করে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ করলেও আরএসএফ একে পুরোনো আইনেরই একটি ‘দুর্বল কপি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল, কারণ নিপীড়নের মূল ধারাগুলো এতে অক্ষুণ্ণ ছিল।
সরকারপন্থী গণমাধ্যমের আধিপত্যের মধ্যেও যে গুটিকয়েক মূলধারার সংবাদপত্র স্বাধীন সাংবাদিকতার চর্চা বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল, তাদেরও শেখ হাসিনা সরকারের চরম রোষানলের শিকার হতে হয়েছে। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো দ্য ডেইলি স্টার , মানবজমিন, প্রথম আলো, ইনকিলাব, আমার দেশ, নয়া দিগন্তসহ আরোও কিছু সংবাদপত্র । ২০০৭-০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রতিবেদন প্রকাশের অভিযোগ এনে ২০১৬ সালে দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে সারা দেশে অন্তত ৭৯টি মামলা দায়ের করা হয়, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির মামলা । সে সময় স্বয়ং শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সম্পাদকদের যুদ্ধাপরাধীদের মতো বিচার করার হুমকি দেন এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় মাহফুজ আনামের রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিচার দাবি করেন। একইভাবে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে প্রথম আলোর সাংবাদিক শামসুজ্জামান শামসকে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে গভীর রাতে তুলে নিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ওই প্রতিবেদনে ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার’ হাস্যকর অভিযোগ এনে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা হয়। পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে যখন শেখ হাসিনা স্বয়ং জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রথম আলোকে “আওয়ামী লীগ, গণতন্ত্র এবং দেশের জনগণের শত্রু” হিসেবে প্রকাশ্যে আখ্যায়িত করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরপরই সরকার সমর্থক যুব সংগঠন প্রথম আলোর কার্যালয়ে ঢুকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়, যাকে সম্পাদক পরিষদ ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলে আখ্যায়িত করেছিল ।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে (২০০৯-২০২৪) স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করতে ‘মানবজমিন’ পত্রিকা ও এর সাংবাদিকদের ওপর কঠোর নিবর্তন ও হয়রানি চালানো হয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ২০২০ সালে যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার অনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাংসদ সাইফুজ্জামান শিখর কর্তৃক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এবং প্রতিবেদক আল-আমিনের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে (ডিএসএ) মামলা দায়ের। এই একই ঘটনার জেরে সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে ৫৩ দিন গুম করে রাখার পর মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দীর্ঘদিন চরম অমানবিক অবস্থায় কারাগারে বন্দি রাখা হয়। এছাড়া ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির খবর প্রকাশ করায় পত্রিকাটির খুলনা প্রতিনিধি রাশেদুল ইসলামের বিরুদ্ধেও নিবর্তনমূলক ডিএসএ আইনে মামলা দেওয়া হয়েছিল; পাশাপাশি সরকারের সমালোচনা করায় মতিউর রহমান চৌধুরীর জনপ্রিয় টকশো ‘ফ্রন্টলাইন’ বন্ধ করে দেওয়া এবং সরকারি বিজ্ঞাপন আটকে দেওয়ার মতো অলিখিত ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পত্রিকাটির ওপর ভয়ের সংস্কৃতি ও চরম সেন্সরশিপ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে সাতক্ষীরায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ভারতীয় বাহিনীর কথিত অংশগ্রহণ নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশের জেরে ‘ইনকিলাব’ কার্যালয়ে মধ্যরাতে গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে এর ছাপাখানা (প্রেস) সিলগালা করে দেয় এবং বার্তা সম্পাদক রবিউল্লাহ রবিসহ তিন সাংবাদিককে নিবর্তনমূলক তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে গ্রেপ্তার করে; পরবর্তীতে পত্রিকাটির সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীনের বিরুদ্ধেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একাধিক হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ‘নয়া দিগন্ত’ পত্রিকাকে শেখ হাসিনার সরকার সবসময়ই শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে বিবেচনা করেছে। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন ও তৎপরবর্তী সময়ে পত্রিকাটির কার্যালয়ে সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর একাধিক হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে এবং এর সাংবাদিকরা মাঠে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় অসংখ্যবার নির্মম মারধর, ক্যামেরা ছিনতাই ও গ্রেপ্তারের শিকার হন। আইসিটি ও ডিএসএ আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার, পুলিশি হয়রানি, সাংবাদিকদের কারাবাস এবং অঘোষিতভাবে সরকারি বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে চরম অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরির মাধ্যমে এই পত্রিকা দুটির কণ্ঠরোধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয়েছিল।
২০১৯ সালে মুক্তিযুদ্ধের একটি বিতর্কিত শব্দ ব্যবহারের জের ধরে উগ্রপন্থী হামলার শিকার হয় ‘দৈনিক সংগ্রাম’ কার্যালয়, যেখানে ভাঙচুর চালানোর পর পত্রিকাটির প্রবীণ সম্পাদক আবুল আসাদকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘকাল কারাগারে আটকে রাখা হয়। এছাড়া দেশের প্রথম সারির অনলাইন পোর্টাল ‘শীর্ষ নিউজ’-এর সম্পাদক একরামুল হককে ২০১১ সালে একের পর এক মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নির্যাতন করা হয় এবং পোর্টালটি দীর্ঘ সময় বন্ধ করে দেওয়া হয়। পূর্বঘোষিতভাবে ‘দৈনিক দিনকাল’-এর ডিক্লারেশন বাতিল করে ২০২৩ সালে সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা, ২০১৬ সালে ‘যায়যায়দিন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শফিক রেহমানকে একটি রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড দিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করা, এবং ২০২০ সালে ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর’-এর প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিরুদ্ধে দুদক দিয়ে হয়রানিমূলক মামলা ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়।
দৈনিক ‘দ্য নিউ এজ’ (The New Age) পত্রিকাটির সম্পাদক নূরুল কবীরকে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি সরকারের অঘোষিত নির্দেশে সব ধরনের সরকারি ও করপোরেট বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়ে পত্রিকাটিকে চরম আর্থিক সংকটে ফেলা হয়েছিল। এছাড়া ২০১৯ সালে দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন পোর্টাল ‘পরিবর্তন ডটকম’-কে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই বিটিআরসি (BTRC) সম্পূর্ণ ব্লক করে দেয়।
২০২০ সালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ এমপির দুর্নীতির খবর প্রকাশের জেরে ‘দৈনিক আমার হবিগঞ্জ’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক সুশান্ত দাস গুপ্তকে এবং ২০২২ সালে ‘দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম’ ও অনলাইন পোর্টাল ‘পাহাড় টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এর সম্পাদক ফজলে এলাহীকে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছর নরসিংদীর ‘দৈনিক গ্রামীণ দর্পণ’-এর বার্তা সম্পাদক রমজান আলী প্রামাণিক এবং ‘নরসিংদী প্রতিদিন’-এর সম্পাদক খন্দকার শাহীনসহ তিন সাংবাদিককে পুলিশি অভিযানের খবর প্রকাশের জেরে গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি ভিন্নমতাবলম্বী লেখকদের বই প্রকাশের অপরাধে ২০২০ সালে ‘গার্ডিয়ান পাবলিকেশনস’-এর স্বত্বাধিকারী নূর মোহাম্মদকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করে তার প্রকাশনীকে অমর একুশে বইমেলা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
অভিযোগ করা হয় ২০১৭ সালে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ এর নেতার শটগানের গুলিতে দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুল এবং ২০২১ সালে নোয়াখালীতে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে দৈনিক বাংলাদেশ সমাচারের তরুণ সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন মুজাক্কির গুলিতে নিহত হন। ২০২৩ সালে জামালপুরে স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও যুবলীগ নেতার দুর্নীতির খবর প্রকাশের জেরে বাংলানিউজ২৪-এর সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিমকে রাস্তায় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া, ২০১৮ সালে দ্য নিউ নেশন পত্রিকার পরিচালনা পর্ষদের প্রধান ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে মানহানির মামলায় গ্রেপ্তার করে আদালতে নেওয়ার পথে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের দ্বারা সশরীরে লাঞ্ছিত ও হেনস্তার শিকার হতে হয় এবং ২০২১ সালে প্রবাসে বসে সরকারের সমালোচনা করা সাংবাদিক ড. কনক সারওয়ারকে দমাতে দেশে থাকা তার নিরপরাধ বোন নুসরাত শাহরিন রাকাকে মধ্যরাতে র্যাব দিয়ে তুলে নিয়ে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মাদক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে আটকে রেখে চরম মানসিক ও শারীরিক নিবর্তন চালানো হয়েছিল।
শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) মাঠপর্যায়ে সত্য প্রকাশ এবং স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের দুর্নীতির খবর তুলে ধরায় আরও বহু সাহসী সাংবাদিক বর্বরোচিত নিবর্তন ও আইনি হয়রানির শিকার হন। এর অন্যতম নিকৃষ্ট উদাহরণ ২০২০ সালে কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম-কে স্থানীয় জেলা প্রশাসকের (ডিসি) অনিয়মের বিরুদ্ধে লেখার অপরাধে মধ্যরাতে ঘরের দরজা ভেঙে তুলে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ভুয়া মাদক মামলায় সাজা প্রদান; একই বছর চট্টগ্রামের সাংবাদিক গোলাম সারোয়ার-কে সংবাদ প্রকাশের জেরে অপহরণ করে তিন দিন আটকে রেখে এমন ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় যে, উদ্ধারের পর তিনি চরম আতঙ্কে “আমি আর লিখব না” বলে সাংবাদিকদের সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। এছাড়া ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি আসনে মোট ভোটারের চেয়ে বেশি ভোট পড়ার সত্য তথ্য দেওয়ায় খুলনার সাংবাদিক হেদায়েত হোসেন মোল্লা-কে এবং ২০২১ সালে একই অঞ্চলের সাংবাদিক আবু তৈয়ব মুন্সিকে তৎকালীন এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর পরিবারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অপরাধে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। মাঠপর্যায়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২০২০ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমান সুমন ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের রামদার কোপে মাথায় মারাত্মক রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম হন এবং বিগত শাসনামলের শেষভাগে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সাংবাদিক ফজলে এলাহী, সাইফুল হাসান, ও দিদারুল আলমসহ একাধিক স্থানীয় সংবাদকর্মীকে পার্বত্য অঞ্চলে প্রভাবশালী মহলের অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশের অপরাধে নিবর্তনমূলক আইনে একের পর এক মামলা দিয়ে প্রতিনিয়ত হয়রানি করা হয়েছিল।
২০১৫ সালে তৎকালীন এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার জেরে আইসিটি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারায় যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে মধ্যরাতে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে হেনস্তা করা হয় এবং ২০১৭ সালে সরকারি বিতরণকৃত একটি ছাগল মারা যাওয়ার সাধারণ খবর শেয়ার করায় খুলনার সাংবাদিক আব্দুল লতিফ মোড়লকে একই ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ২০২৩ সালে ভূমিদস্যুতার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাতক্ষীরার সাংবাদিক রঘুনাথ খাঁ ডিবি পুলিশ কর্তৃক অপহৃত হয়ে কার্যালয়ে উল্টো করে ঝুলিয়ে ইলেকট্রিক শকের মতো নৃশংস নির্যাতনের শিকার হন, ২০১৭ সালে অনলাইন পোর্টালের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক উৎপল দাসকে টানা ৭১ দিন রহস্যজনকভাবে গুম করে রাখার পর চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে যাওয়া হয় এবং ২০২৪ সালে তথ্য অধিকার (RTI) আইনে প্রকল্পের ব্যয়ের তথ্য চাওয়ায় শেরপুরের সাংবাদিক শফিউজ্জামান রানাকে স্থানীয় ইউএনও তাৎক্ষণিক ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত’ বসিয়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়ে জেলে পাঠান। পাশাপাশি ২০২১ সালে জেলা প্রশাসনের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে খুলনার স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদক শফিকুজ্জামান তরফদার ও বার্তা সম্পাদক কামরুজ্জামান বাবুকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাতের আঁধারে গ্রেপ্তার করার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে সরকারের সমালোচনা বা প্রশাসনের সামান্যতম অনিয়ম তুলে ধরলেই সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম নিবর্তন নেমে আসতো।
পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের অপরাধে আশুলিয়ার প্রবীণ সাংবাদিক নাজমুল হুদাকে আইসিটি অ্যাক্ট ও বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ একযোগে ছয়টি ভুয়া মামলায় জড়িয়ে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়; একটি সংবাদের জেরে এক বিচারক কর্তৃক আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় হয়রানিমূলক মামলার শিকার হন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক গোলাম মুজতবা ধ্রুব। এছাড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা রুহুল আমিন গাজীকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ ১৭ মাস কারাবন্দি রেখে চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। মাঠপর্যায়ে সত্য তুলে ধরতে গিয়ে ২০১৮ সালে পাবনায় নিজ বাসার সামনে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় আনন্দ টিভির নারী প্রতিনিধি সুবর্ণা নদীকে এবং স্থানীয় ক্ষমতাসীন নেতাদের দুর্নীতির খবর প্রকাশের জেরে ভোলার লালমোহনের সাংবাদিক নাইমুল ইসলাম ও টাঙ্গাইলের সাংবাদিক রাশেদুল হাসানকে হাত-পা ভেঙে দিয়ে নির্মম শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল। সরকারের কঠোর নজরদারি, মামলা ও গুমের ভয়ে একুশে টিভির সাবেক সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক তাসনীম খলিলসহ বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যমকর্মী দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
এছাড়া কারাপ্রকোষ্ঠে প্রাণ হারান লেখক মুশতাক আহমেদ এবং চরম নির্যাতন ও দীর্ঘ কারাবাসের শিকার হন কার্টুনিস্ট আহমেদ কবীর কিশোর, আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, প্রবীণ সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ ও রুহুল আমিন গাজী, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক প্রবীর সিকদার, রাষ্ট্রচিন্তার দিদারুল আলম ভূঁইয়া এবং ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন।
আইনি হয়রানির পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক আক্রমণ, গুম, হত্যা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের এক ভয়াবহ বিচারহীনতার সংস্কৃতি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়েছিল শেখ হাসিনার পুরো শাসনামল জুড়ে। এর সবচেয়ে মর্মান্তিক উদাহরণ হলো ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার এবং মেহেরুন রুনির নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ব্যাপক দুর্নীতি নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের ঠিক আগমুহূর্তে তাদের নিজেদের বাসভবনে পাঁচ বছরের শিশু সন্তানের সামনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি দিলেও এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও শেখ হাসিনা সরকার এর কোনো বিচার করেনি । জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়াররা এক যৌথ বিবৃতিতে একে “সর্বব্যাপী বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এছাড়া ২০১৬ সালে ৮১ বছর বয়সী প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমানকে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণের এক কাল্পনিক অভিযোগে গভীর রাতে নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামের সাংবাদিক আইয়ুব মিয়াজীকে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের জেরে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা দোতলা ভবনের ছাদ থেকে ফেলে হত্যার চেষ্টা করে। প্রবাসী সাংবাদিক শফিউর রহমানকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার কপালের ওপর লাল টার্গেট চিহ্ন বসিয়ে ছবি প্রচার করা হয় ।
প্রবীণ সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেহকে তার কর্মস্থল বাসসে আওয়ামী লীগ এর কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আরেকজন আওয়ামী সমর্থক সাংবাদিক মধুসুধন মন্ডল মারধর করে সেখান থেকে বের করে দেয়। কোনো প্রকার যৌক্তিক কারণ না দেখিয়েই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
ভিন্নমত দমনের অংশ হিসেবে প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চাকরিচ্যুত, কালো তালিকাভুক্ত এবং পেশা থেকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করার এক নিষ্ঠুর নীতি নেওয়া হয়েছিল। এর অন্যতম বড় শিকার প্রবীণ সাংবাদিক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান; যার তীক্ষ্ণ লেখনী ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাকে নানামুখী চাপ, ভুয়া মামলা ও অলিখিত গোয়েন্দা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে মূলধারার সাংবাদিকতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে এক চরম অবরুদ্ধ ও নির্বাসিত জীবন কাটাতে বাধ্য করা হয় এবং তার পেশাগত ক্যারিয়ারকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তার পাশাপাশি এই দীর্ঘ শাসনামলে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, ছাঁটাই, অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা, দীর্ঘ কারাবাস, অমানুষিক নির্যাতন, গুম, নির্বাসন ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন আরও অসংখ্য সংবাদকর্মী, সাংবাদিক নেতা ও মুক্তমনা লেখক, যাদের মধ্যে রয়েছেন, আবু সালেহ, এম আবদুল্লাহ, রুহুল আমিন গাজী, শওকত মাহমুদ, এম এ আজিজ, জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, মাহমুদ শফিক, মহিউদ্দিন খান মোহন, গোলাম মহিউদ্দিন খান, শামসুদ্দিন হারুন, সামছুল হক দুররানী, আসাদুজ্জামান আসাদ, কামার ফরিদ, সাহাদাত হোসেন, বুলবুল আহমেদ, ফকির শওকত, আবদুল গাফফার মাহমুদ, জহিরুল হক রানা, আনোয়ারুল কবীর নান্টু,তাসনীম খলিল, ইলিয়াস হোসেন, জুলকারনাইন সায়ের খান, ডেভিড বার্গম্যানসহ আরও কতো যে নাম আছে যা লিখে শেষ করা যাবে না ।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো ১৫ বছরের ইতিহাস মূলত সংবাদমাধ্যমের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে সাংবাদিকদের নিশ্চুপ করার ইতিহাস। তারা একদিকে অনুগত ব্যবসায়ীদের মিডিয়া লাইসেন্স দিয়ে আজ্ঞাবহ একটি গণমাধ্যম বলয় তৈরি করেছিল, অন্যদিকে ভিন্নমতের সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইনে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল। চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি, যায় যায় দিন , আমার দেশ বা দৈনিক দিনকালের মতো বিরোধী কণ্ঠস্বরগুলোকে স্তব্ধ করে দেওয়া এবং সাগর-রুনির মতো প্রতিবাদী সাংবাদিকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার না করা এসবই ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় ব্লু-প্রিন্ট। আজ ২০২৬ সালের এই পরিবর্তিত ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা অতীতের দিকে তাকাই, তখন এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে শেখ হাসিনার সরকার কেবল রাজনৈতিক অধিকারই হরণ করেনি, দেশের মানুষের জানার অধিকার এবং সত্য প্রকাশের স্বাধীনতাকেও পুরোপুরি শিকলবদ্ধ করে রেখেছিল। অতীতের সেই বিভীষিকাময় অধ্যায় আজকের এবং আগামী দিনের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য বড় শিক্ষা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচারী শাসক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এমন নির্মম ও পদ্ধতিগত আক্রমণ চালানোর দুঃসাহস দেখাতে না পারে। লেখায় অনেকের নাম আসেনি। কত শত সাংবাদিককে যে অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে তার হিসেব নেই । কেবলমাত্র তৎকালীন অবস্থাকে তুলে ধরার জন্য কয়েকজনের নাম উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করেছি । কিছু ঘটনাকে সামনে এনে পরিস্থিতির কোন পর্যায়ে ছিলো সেটির ধারণা দিয়েছি। আমার এই সীমাবদ্ধতার জন্য আগাম ক্ষমা প্রার্থী।