
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হলো; তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক জমজমাট বৈশ্বিক নির্বাচনে বিশ্বের সর্বোচ্চ ফোরাম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম মর্যাদাপূর্ণ অধিবেশনের নতুন সভাপতি (প্রেসিডেন্ট) নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের বর্তমান সফল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
আজ মঙ্গলবার (২ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরের মূল সাধারণ পরিষদকক্ষে (জেনারেল অ্যাসেম্বলি হল) সংস্থাটির প্রতিষ্ঠিত কার্যবিধির ৩০ নম্বর বিধি অনুযায়ী এই আনুষ্ঠানিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়। এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের আঞ্চলিক পালাক্রম (রোটেশন) পদ্ধতি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ভোটে বাংলাদেশের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রভাবশালী বিশেষ দূত ও রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করে মোট ৯৯ ভোট পেয়ে ড. খলিলুর রহমান বিশ্বমঞ্চের এই শীর্ষ আসনে চূড়ান্তভাবে জয়ী হয়েছেন। বাংলাদেশের এই অবিস্মরণীয় ও অভাবনীয় বিজয়ের পরপরই জাতিসংঘের সদর দপ্তরে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা ড. খলিলুর রহমান এবং বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলকে উষ্ণ অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান; অন্যদিকে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক বিজয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাৎক্ষণিকভাবে গভীর আনন্দ প্রকাশ করে দেশের কূটনৈতিক মিশন ও দেশবাসীকে বিশেষ অভিনন্দন জানিয়েছেন।
কূটনৈতিক সূত্র ও নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই বৈশ্বিক নির্বাচনটিকে ঘিরে গত কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ ও লবিং চলছিল; বিশেষ করে গত মে মাসে বর্তমান সাধারণ পরিষদের সভাপতি জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বায়ারবকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত অনানুষ্ঠানিক ‘ইন্টারঅ্যাকটিভ’ সংলাপে ড. খলিলুর রহমান তাঁর দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা ও ‘ভিশন স্টেটমেন্ট’ উপস্থাপনের পর থেকেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় হতে শুরু করে। এর আগে মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী সংগঠন ‘ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা’ (ওআইসি)-এর সদস্য দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের এই প্রার্থিতার পক্ষে বিশ্বজুড়ে একযোগে জোরদার কূটনৈতিক প্রচার চালানোর পাশাপাশি পূর্ণ ও দ্ব্যর্থহীন সমর্থন ব্যক্ত করায় বাংলাদেশের এই বিজয় অনেকাংশেই সহজ ও সুনিশ্চিত হয়ে ওঠে। সাধারণ পরিষদের এই নতুন সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক এক আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে স্পষ্ট ভাষায় অঙ্গীকার করেন যে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট আঞ্চলিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমস্ত সদস্য রাষ্ট্রের জন্য একজন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, নিবেদিতপ্রাণ ও নিবেদিত ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন করবেন এবং দায়িত্ব পালনকালে জাতিসংঘ সনদ অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চলমান নানা ভূ-রাজনৈতিক মতভেদের মধ্যেও ঐকমত্য গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ কাজ করবেন। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই ঐতিহাসিক ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে এবং আগামী ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের বিশেষ ভাষণের মধ্য দিয়ে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শুরু হবে, যা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের এই কৃতি সন্তানের সরাসরি পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয়ে বিশ্ব কূটনীতিতে বাংলাদেশের এক নতুন যুগের সূচনা করবে।