
প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাকে অর্থনৈতিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক- কোনো দিক থেকেই সমর্থনযোগ্য নয় বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে লেকশোর হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের সুযোগ বারবার দেওয়া হলেও সরকারের রাজস্ব আয় খুব একটা বাড়ে না, বরং এটি সৎ করদাতাদের জন্য একটি ‘মরাল হ্যাজার্ড’ বা নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।’
সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কালো টাকা সাদা করার বিষয়টি অর্থনৈতিকভাবে যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি নৈতিকভাবেও কাম্য হতে পারে না। কারণ, যারা নিয়মিত ও সঠিকভাবে কর দিচ্ছেন, তারা এতে নিরুৎসাহিত হন, তাদের মনে এই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, এখন কর না দিয়ে পরবর্তীতে বাড়তি সুবিধা নিয়ে টাকা সাদা করার সুযোগ নিলে সেটিই হয়তো বেশি লাভজনক। এছাড়া রাজনৈতিকভাবেও এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সাধারণ মানুষ মনে করেন, দুর্নীতিবাজ ও কর ফাঁকিবাজদের সরকার বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপানো হচ্ছে।
জমি ও ফ্ল্যাট কেনায় অসংগতি
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেট বক্তৃতায় সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও জমি ও ফ্ল্যাট কেনায় ভিন্নভাবে এই সুযোগ রাখা হয়েছে। মূলত জমি ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এই সুযোগ বেশি দৃশ্যমান হয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মৌজা রেট বা নির্ধারিত দামের সাথে বাজারের প্রকৃত দামের বড় ধরনের বৈসাদৃশ্য রয়েছে। এই নীতিমালার দুর্বলতার কারণেই অনেক টাকা অপ্রদর্শিত বা ‘কালো’ হয়ে যায়। সরকার এখন মৌজা রেট হালনাগাদ করার পরিকল্পনা করছে এবং একে এই ধরনের সুযোগ দেওয়ার একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে যে, নীতিমালার পরিবর্তনের আগে এটিই হবে ‘শেষ সুযোগ’।
বিনিয়োগের পরিবেশ ও রাষ্ট্রের দায়
কেবল শুল্ক ছাড় বা বিশেষ সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল ব্যবসায়িক পরিবেশ ও উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সিপিডির মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা রাষ্ট্রের একান্ত দায়িত্ব। বিনিয়োগের প্রস্তাব বা কর সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি যদি ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না করা হয়, তবে বাজেটের এসব উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না।
সিপিডি মনে করে, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভিত্তিহীন প্রাক্কলন না করে বাস্তবতার নিরিখে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। সম্পদ আহরণ ও বণ্টনের এই প্রক্রিয়ায় যদি স্বচ্ছতা না থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বানিজ্য/হা