বিগত ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান বলুন, আর বিপ্লবী বলুন; এর মাধ্যমেই একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পর বাংলাদেশের মানুষ বর্তমান সংসদ পেয়েছে। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এই সংসদের কাছে আমার প্রত্যাশা অনেক। সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে। এখন দ্বিতীয় অধিবেশন চলছে। এই অধিবেশনটা বাজেট অধিবেশন। ইতিমধ্যে বাজেট পেশ হয়েছে। বাজেটের পাশাপাশি অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়েও সংসদ সদস্যরা কথা বলছেন। প্রথম অধিবেশনের মতোই এই অধিবেশনেও উত্তাপ ছড়ানো শুরু হয়েছে। গঠনমূলক আলোচনা নয়, উত্তাপ ছড়াচ্ছে অসংসদীয় কথাবার্তা। প্রথম অধিবেশনের মতো আমি এই দ্বিতীয় অধিবেশনের দিকেও নিয়মিত নজর রাখছি। কিন্তু সংসদ সদস্যদের কথাবার্তা শুনে হতাশ হচ্ছি। এক ধরনের বিরক্তির সৃষ্টি হচ্ছে। এই বিরক্তি থেকেই এই লেখা।

দ্বিতীয় অধিবেশনে ৫০ জন নারী সংসদ সদস্য যুক্ত হয়েছেন। এখন সংসদে সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৩৫০। এই সংসদের এরাই তো দেশের ১৮ কোটি মানুষের নেতা। এই নেতারা আমাদের সামনে কেমনভাবে আচরণ করেছেন? টেলিভিশন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে দেশের মানুষ সেসব অবলোকন করেছে। আমাদের সংসদ সদস্যরা কি সংসদে যে আচরণ করছেন, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, সে বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন? খোঁজখবর নিলেও চামচা-চাটুকারদের কাছে হয়তোবা পেয়েছেন! আমজনতার মতামত জানেননি। আমি আমজনতার একজন। সে কারণে আমার কিছু খেদ প্রশমিত করার জন্য এই লেখায় কিছু কঠিন কথাই হয়তো বলব।

লেখাটা কীভাবে কে নেবেন, আমি জানি না। কিন্তু না লিখলে আমি নিজের কাছে অপরাধী হয়ে থাকব। আমার ভেতরে অবিরাম যন্ত্রণা কাজ করবে। আর আমাদের সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির আওতায়, সংসদ সদস্যদের ভাষা, আচার-আচরণ, কথা বলার স্টাইল—এসব সাধারণ মানুষের একটু বোঝার বিষয় আছে, তাই আমি লেখার গভীরে যাচ্ছি।

সংসদ কেবল একটি ভবন নয়। এটি রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্র। আইন প্রণয়নের কর্মশালা। গণতন্ত্রের দৃশ্যমান মঞ্চ। এখানে ভাষা শুধু উচ্চারিত হয় না, ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়। যদিও নতুন সরকার, নতুন প্রত্যাশা; কিন্তু পুরোনো কিছু দৃশ্য আবারও ফিরে এসেছে। উচ্চস্বরে বক্তব্য, চিৎকার, খোঁচা কিংবা কটাক্ষ করে বলা কথায় টেবিল চাপড়ানো। মাঝে মাঝে ব্যক্তিগত আক্রমণও। এইসব দেখে প্রশ্ন জাগে, সংসদে ভাষা কেমন হওয়া উচিত?

প্রথমেই মৌলিক বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার। সংসদ সদস্যরা প্রতিনিধি—জনগণের প্রতিনিধি। তারা কণ্ঠস্বর বহন করেন সাধারণের। কিন্তু সাধারণের সেই কণ্ঠস্বর কি মাত্রাহীন হতে পারে? নিশ্চয়ই না। সংসদে ভাষা হওয়া উচিত সংযত, যুক্তিনির্ভর, স্পষ্ট ও শালীন। সংসদে বক্তব্য হওয়া উচিত প্রাসঙ্গিক, তথ্যসমৃদ্ধ ও নীতিগত। সংসদের কাজ আইন করা, নীতি নির্ধারণ করা, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তাই আলোচনার বিষয়ও হওয়া উচিত এসবের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এর মানে এই নয় যে বাইরের কোনো বিষয় সংসদে আসবে না। বরং জনজীবনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সংসদে উঠতেই পারে, ওঠা উচিত।

সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন আলোচনা তথ্য থেকে সরে যায়, যুক্তি থেকে সরে যায়, ব্যক্তি আক্রমণে গড়ায়, আবেগে ভেসে যায়। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি এই বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা দেয়। সেখানে বলা আছে, সদস্যরা যেন অশোভন, অসম্মানজনক বা আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার না করেন। ব্যক্তিগত অভিযোগ তোলা যাবে না, যদি না তা প্রমাণসহ এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় আনা হয়। বিচারাধীন বিষয়ে আলোচনা সীমিত রাখতে হয়। স্পিকারের নির্দেশ মানা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, নিয়ম আছে, কাঠামো আছে; কিন্তু প্রয়োগটাই মূল বিষয়।

ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, এই সমস্যা নতুন নয়। আমাদের সংসদের অতীতেও উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে, তর্ক হয়েছে, তীব্র সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু সব সময় তা একই রকম ছিল না। প্রথম দিকের সংসদে বিতর্ক ছিল তীক্ষ্ণ, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ভাষা ছিল পরিমিত। দীর্ঘ বক্তৃতা হতো, তথ্য উপস্থাপন হতো। বিরোধী দল সরকারের কঠোর সমালোচনা করত, কিন্তু প্রায়ই যুক্তির ভেতরেই থাকত। পরে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ে। সংসদে বয়কট সংস্কৃতি তৈরি হয়, উপস্থিতি কমে। আর যখন উপস্থিতি থাকে, তখন অনেক সময় তা উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ পায়।

কিছু অধিবেশনে দেখা গেছে, পুরো অধিবেশন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। স্লোগান, প্রতিবাদ, হট্টগোল—এসব সংসদের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করেছে। আইন পাস হয়েছে আলোচনা ছাড়াই। এতে সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে তাকালেও একই রকম উদাহরণ আছে। অনেক গণতান্ত্রিক দেশে সংসদে তর্ক তীব্র হয়, কখনো কখনো উত্তপ্তও হয়। কিন্তু সেখানে একটি সীমা বজায় রাখার চেষ্টা থাকে। ভাষার শালীনতা রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়। কারণ ভাষা শুধু শব্দ নয়, এটি সংস্কৃতি; এটি রাজনৈতিক আচরণের প্রতিফলন।

সংসদ সদস্যদের ভাষা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ তারা রোল মডেল। তাদের আচরণ সমাজে প্রভাব ফেলে। টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সম্প্রচারিত সংসদ অধিবেশন সাধারণ মানুষ দেখে, তরুণরা দেখে, শিক্ষার্থীরা দেখে। তারা শেখে, বিতর্ক কীভাবে করতে হয়। যদি তারা দেখে, চিৎকার করলেই জেতা যায়, তাহলে সেটাই শেখা হয়। যদি তারা দেখে, যুক্তি দিয়ে কথা বলা হয়, তাহলে সেটাই প্রতিষ্ঠিত হয়।

সংসদে ভাষা হওয়া উচিত দৃঢ়, কিন্তু ভদ্র; কঠোর, কিন্তু সম্মানজনক। বিরোধিতা করা যাবে, কিন্তু অবমাননা করা যাবে না। একজন সদস্য সরকারের নীতির বিরোধিতা করতে পারেন, করা উচিত—সেটাই গণতন্ত্র। কিন্তু তিনি যদি ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন, তাহলে তা সংসদের মান কমায়। সংসদে আলোচনার বিষয় নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। জনস্বার্থের যেকোনো বিষয় সংসদে আসতে পারে। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক—দেশের মানুষের জন্য যা যা প্রয়োজন, সবই সংসদে আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক। এমনকি আন্তর্জাতিক ঘটনাও আসতে পারে, যদি তার প্রভাব দেশের ওপর পড়ে। কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক বিষয় টেনে আনা, ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ বা রাজনৈতিক নাটক তৈরি করা—এসব সংসদের কাজ নয়।

কার্যপ্রণালি বিধির অনেক অনেক নীতির মধ্যে আমার বিবেচনায় কয়েকটি নীতি সংসদ সদস্যদের অত্যধিক খেয়াল রাখা প্রয়োজন। সেগুলো হচ্ছে: বক্তব্য বিষয়বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে, অন্য সদস্যের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, স্পিকারের নির্দেশ মানতে হবে, অশালীন শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। আলোচনা হবে তথ্য ও তত্ত্বভিত্তিক এবং তথ্যভিত্তিক আলোচনাকে উৎসাহিত করার জন্য টেবিল চাপড়ানো অবশ্যই হবে।

সংসদের পরিবেশ উন্নত করতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিবেচনা থেকে এগুলোও উল্লেখ করছি: রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলের ভেতরের শৃঙ্খলা, স্পিকারের দৃঢ়তা ও জনগণের প্রত্যাশা। উপরোক্ত বলা সকল কথাই কার্যপ্রণালি বিধিতে আছে। কিন্তু আমাদের নেতারা সব সময় সেটা খেয়ালে রাখেন না। কথাগুলো এজন্য বললাম, যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সদস্যদের সংযত আচরণে উৎসাহিত করে, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব। যদি স্পিকার নিরপেক্ষভাবে নিয়ম প্রয়োগ করেন, তাহলে শৃঙ্খলা বাড়ে। আর যদি জনগণ শালীন বিতর্ককে মূল্য দেয়, তাহলে রাজনীতিবিদরাও সেই পথে হাঁটেন। অতীতে কিছু ইতিবাচক উদাহরণও আছে। এমন অধিবেশন হয়েছে, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে নীতিগত বিতর্ক হয়েছে, বাজেট নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে, বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাব এসেছে, সরকার তার জবাব দিয়েছে। এই ধরনের সংসদ কার্যক্রমই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।

আবার কিছু নেতার ব্যক্তিগত আচরণও উদাহরণ হতে পারে। কেউ কেউ তীব্র বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু ভাষায় শালীনতা বজায় রেখেছেন। এখানে আমি উল্লেখ করতে পারি, প্রয়াত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নানা বিষয়ের তথ্য-উপাত্তসমৃদ্ধ বিতর্কগুলোর কথা। এর বাইরেও কেউ কেউ সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর বক্তব্য দিয়েছেন। কেউ কেউ তথ্য দিয়ে বিতর্ককে সমৃদ্ধ করেছেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সংসদের প্রতিটি শব্দ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি অসংযত মন্তব্য মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এতে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সংসদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এখন আগের চেয়ে বেশি দায়িত্বশীল হওয়া দরকার। সংসদ সদস্যদের মনে রাখা উচিত, তারা কেবল দলের প্রতিনিধি নন, তারা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। তাদের ভাষা রাষ্ট্রের ভাষা হয়ে যায়। সংসদে যদি সংলাপের সংস্কৃতি তৈরি হয়, তাহলে রাজনৈতিক মেরুকরণ কমতে পারে। সংসদে যদি যুক্তির জয় হয়, তাহলে নীতিনির্ধারণ উন্নত হয়। সংসদে যদি শালীনতা থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের মর্যাদা বাড়ে। চিৎকার সহজ, যুক্তি কঠিন। হট্টগোল তাৎক্ষণিক মনোযোগ আনে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান দেয় না।

আমি ছোট মানুষ, বড় কথা বলা আমার শোভা পায় না, তারপরও বলে ফেলি। আমার বিবেচনায় একজন ভালো সংসদ সদস্য হবেন তিনি, যিনি শুনতে পারেন, যিনি তথ্য সংগ্রহ করেন, যিনি স্পষ্টভাবে কথা বলেন; যিনি বিরোধিতা করেন, কিন্তু সম্মান বজায় রাখেন; যিনি আবেগ নয়, যুক্তিকে প্রাধান্য দেন।

সংসদকে যদি সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হয়, তাহলে ভাষার সংস্কার জরুরি। এটি কোনো ছোট বিষয় নয়। এটি গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করে। সংসদ কেবল কথা বলার স্থান নয়, এটা দায়িত্ব পালনেরও জায়গা। সেই দায়িত্ব কার জন্য পালন করবেন? নিজের জন্য তো অবশ্যই, সেই সাথে দেশের ও দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। শেষ কথা বলি, আমাদের সংসদে গর্জা-গর্জির বক্তব্য বন্ধ হোক। তথ্যসমৃদ্ধ যুক্তিনির্ভর কথাবার্তা বক্তৃতার মাধ্যমে জাতিকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার কেন্দ্রবিন্দু হোক এই জাতীয় সংসদ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *