
একদিকে লিওনেল মেসি, অন্যদিকে রিয়াদ মাহরেজ, এদিকে রদ্রিগো দি পল, ওদিকে ইব্রাহিম মাজা। কার সঙ্গে কার তুলনা! উগ্র আর্জেন্টাইন সমর্থকদের অনেকে গালি দিতে পারেন, পাগলের প্রলাপ বলেও উড়িয়ে দিতে পারেন। তবে বিশ্বকাপের বাস্তবতা যদি কিছুটা হলেও মানেন, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ শুরুর ইতিহাসটা যদি জানেন, এই তুলনাও আপনাকে মানতে হবে। আর্জেন্টিনা বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। এবারও শিরোপার হিসেবে ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগালের সঙ্গে তাঁদের নাম। কিন্তু ওই যে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ! যেটিতে নামার আগে আর্জেন্টাইনদের হৃদয় কাঁপে! ১৯৯০ বিশ্বকাপ দূরের ইতিহাস, ২০২২ কাছের! কাতারের মাটিতে সৌদি রুপকথা সবারই জানা। এবার যে আলজেরিয়া সৌদি আরব কিংবা ক্যামেরুন হবে না তার নিশ্চয়তা কি? ২০২৬ বিশ্বকাপ তো সেই অনিশ্চয়তার গানই গাইছে! স্পেনকে আটকে দিল অখ্যাত কেপ ভার্দে, জাপানে নেদারল্যান্ডস, সৌদিতে উরুগুয়ে, মরক্কোয় ব্রাজিল! কখন কার জালে কে আটকা পড়ে বলা কঠিন। আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ বলেই আলজেরিয়ার সামনে এখন রুপকথার সুযোগ!
একদিক থেকে তো প্রথম ম্যাচে হেরে যাওয়া আর্জেন্টিনার জন্য আশির্বাদ! ৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের কাছে হারের পর ফাইনালে উঠে রানারআপ, ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে হেরে শেষপর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন! তবে বিশ্বকাপের প্রথম কিংবা শেষ ম্যাচ হোক, হারতে চায় কে। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাও কাল জয়ই চাইবে। শুধু যে আলজেরিয়া ম্যাচ গুরত্বপূর্ণ এমন নয়, শিরোপা ধরে রাখার মিশনে লায়নেল স্কালোনির দলের জন্য সব ম্যাচই বিশেষ কিছু। আলজেরিয়ার পাশাপাশি শক্তিশালী অস্ট্রিয়া আর জর্ডান জে গ্রুপে আলবিসেলেস্তেদের সঙ্গী। ফাইনাল হিরো এ্যাঞ্জেল দি মারিয়া, দিবালা, আকুনা ছাড়া গত বিশ্বকাপ দলের প্রায় সবাই আছেন এবারও। লায়নেল স্কালোনি তাই একাদশ সাজাতে পড়েছেন মধুর সমস্যায়। টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের চ্যালেঞ্জ নেয়া ৩৮ বছরের লিওনেল মেসির হাতেই দলের নেতৃত্ব। প্রতিপক্ষের রক্ষনে আতঙ্ক ছড়াতে মেসির সাথে আছেন হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্টিনেজ। মাঝমাঠে রদ্রিগো দি পলের সঙ্গে এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক এ্যালিস্টার, থিয়াগো আলমাদা, সিমিওনে। রক্ষণভাগ নিয়ে অবশ্য কিছুটা দুশ্চিন্তা আছে। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও তাগলিয়াফিকো ইনজুরিতে ছিলেন। রোমেরো কিছুটা সেরে উঠলেও তাগলিয়াফিকো এখনো পুরোপুরি ফিট নন। আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের মূল দায়িত্ব তাই নিতে হচ্ছে ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় দাঁড়ানো নিকোলাস ওতামেন্দিকে। রোমেরো লিসান্দ্রো মার্টিনেজ আর ফাকুন্দো মেদিনা হতে পারেন তার রক্ষণসঙ্গী। আর আঙুলের চোট কাটিয়ে গোলপোস্টে এমিলিয়ানো মার্টিনেজই ফিরছেন। আর্জেন্টিনার শক্তি, অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই ছক সাজাচ্ছে আলজেরিয়া।
বুধবার সকাল ৭টার ম্যাচে তাঁদের অনুপ্রেরণা প্রস্তুতি ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে দেয়া। আলজেরিয়ানদের পোস্টার বয় ম্যানসিটির সাবেক তারকা রিয়াদ মাহরেজ। সৌদি লীগে খেলা মাহরেজ হয়তো সেরা সময়টা পেছনে ফেলে এসেছেন, তবে ডানপ্রান্তে এখনো তিনি দলের বড় ভরসা। এই আলজেরিয়া দলের গোপন অস্ত্র হতে পারেন কুড়ি ছোঁয়া তরুণ মিডফিল্ডার ইব্রাহিম মাজা। জার্মান ক্লাব লেভারকুসেনের হয়ে এই মৌসুমে দারুণ খেলেছেন। এরই মাঝে মাজার দিকে চোখ পড়েছে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের। রক্ষণে আছেন ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলা লেফটব্যাক রায়ান আইত নূরি, যার গতির ঝড়ের পরীক্ষা নিতে হতে পারে আর্জেন্টিনার মলিনা, মন্তিয়েলকে। ডর্টমুন্ডের বেনসেবানিও আছেন রক্ষণে বড় ভরসা হয়ে। আর আলজেরিয়ার গোলপোস্টে দাঁড়াবেন লুকা জিদান। নামটা শুনে কেমন পরিচিত পরিচিত লাগছে না। আপনার অনুমানই সঠিক, ফ্রান্স কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের ছেলে লুকা জিদান। ফ্রান্সের মায়া ছেড়ে দাদা-দাদীর শেকড়ের আলজেরিয়াকেই বেছে নিয়েছেন লুকা জিদান। ইতিহাস বলছে চমকে দেয়ার মতো ক্ষমতা আলজেরিয়ার আছে। ১৯৮২ সালে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানীকে হারিয়ে দিয়েছিল তাঁরা। ২০১৪ বিশ্বকাপেও আলজেরিয়ার আগুনে পুড়তে যাচ্ছিল জার্মানী! দ্বিতীয় রাউন্ডের সেই ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ের গোলে জিতে যায় ফিলিপ লামের জার্মানী। এরপর ১২ বছরের অপেক্ষা। কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচই পথ দেখিয়ে আলজেরিয়াকে নিয়ে এসেছেন এবারের বিশ্বকাপে। জার্মানী, নেদারল্যান্ডসের পর আলজেরিয়ার এবারের শিকার কি তাহলে আর্জেন্টিনা? নাকি মেসি, আলভারাজ গড়ে দিবেন ম্যাচের ভাগ্য। উত্তর মেলাতে অপেক্ষা আর কয়েক ঘন্টার।