
সিলেটের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন জনবিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ভাঙতে গিয়ে মাত্র কয়েক দিন আগেই যিনি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সেই জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমকে আকস্মিক দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে ফুঁসছে পুরো সিলেট।
সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রোববার সিলেটে বিশাল মানব বন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছেন সর্বস্তরের মানুষ। বিক্ষুব্ধ নাগরিক, সুধীসমাজ, ব্যবসায়ী এবং ছাত্র-জনতার স্পষ্ট দাবি—এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটে বহাল রাখতে হবে।
সিলেটের ঐতিহাসিক কোর্ট পয়েন্টে ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জড়ো হতে থাকেন হাজার হাজার মানুষ। ব্যানারগুলোতে লেখা ছিল—‘মাজারের স্বচ্ছতা আনার পুরস্কার কি বদলি?’, ‘জনবান্ধব ডিসি সারওয়ার আলমের প্রত্যাহার মানি না’, ‘সিলেটের উন্নয়ন স্তব্ধ করার চক্রান্ত রুখে দাঁড়াও’। এই মানববন্ধন এক বিশাল গণ-সমাবেশে রূপ নেয়। নগরীর প্রধান ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র কোর্ট পয়েন্টে আয়োজিত কর্মসূচিতে শত শত সাধারণ পথচারী ও পেশাজীবী মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করেন।
মানববন্ধন ও সমাবেশে অংশ নেওয়া সিলেটের সচেতন মহলের দাবি, এই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের পেছনে সাধারণ কোনো প্রশাসনিক কারণ নেই; বরং এর পেছনে রয়েছে এক গভীর রহস্য ও স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্ত।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মাজারের এই বিপুল পরিমাণ বেহিসাবি অর্থের ওপর সুদীর্ঘকাল ধরে যাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল, প্রশাসনের এই সাহসী ও যুগান্তকারী সংস্কারে তারা মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ হয়। মাজারের দীর্ঘদিনের চেনা ঐতিহ্য ও স্বায়ত্তশাসনে ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’-এর ধুয়া তুলে তারা সরকারের ওপর মহল থেকে তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষের স্পষ্ট ধারণা, ওই কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের তীব্র তদবির এবং ওপর মহলের চাপের কারণেই মাজারের ডেগ সিলগালার মাত্র তিন দিনের মাথায় জেলা প্রশাসককে সরিয়ে দেওয়ার এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এসেছে।
যোগদানের পর থেকেই মো. সারওয়ার আলম সিলেটের সাধারণ মানুষের কাছে ‘জনগণের ডিসি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ভূমি দস্যুদের হাত থেকে সরকারি খাস জমি ও জলাশয় রক্ষা, সিলেটের নদী বাঁচাতে বালু দস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর টাস্কফোর্স অভিযান এবং সাধারণ ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করার কারণে তিনি সর্বস্তরে প্রশংসিত হন। তার কার্যালয়ের দরজা সাধারণ ভুক্তভোগী মানুষের জন্য সবসময় উন্মুক্ত থাকত।
সমাবেশে অংশ নিয়ে সিলেটের এক জ্যেষ্ঠ নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যখনই একজন সৎ, নির্ভীক এবং জনবান্ধব কর্মকর্তা সিলেটের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে শুরু করেন, তখনই স্বার্থান্বেষী মহলের ইশারায় তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। মো. সারওয়ার আলম কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের তোয়াক্কা না করে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করছিলেন। এই অন্যায্য প্রত্যাহার সিলেটবাসী কোনোভাবেই মেনে নেবে না।”
সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারে চাকরির কোনো ক্ষতি নেই। ক্ষতি হলো সিলেটের মানুষের বলে ক্ষোভ জানিয়ে ব্রিটেনের বাংলাদেশী কমিউনিটির সফল পেশাজীবী ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার নাজির উদ্দিন ফেইসবুকের এক পোস্টে তিনি বলেন, সৎ, সাহসীকতা ও দৃঢ়তার প্রতিদান এভাবে প্রদান করলে সৎ ও সাহসী অফিসাররা উঠে আসবে কিভাবে?
তিনি আরও বলেন, আধুনিক সিলেট গড়তে তাঁর স্বপ্ন ও প্রবাসীদের জন্য ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা। তবে তিনি যেভাবে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুচ্ছিলেন তাতে অসৎ, দুর্নীতিবাজ ও মতলববাজদের পেঠে লাথি পড়েছিল। প্রথম থেকেই আমার ভয় ছিল ঐ স্বার্থান্বেষীরা তাকে এখানে বেশি দিন থাকতে দিবে না। আমার আশংকাই সত্য হলো।
উল্লেখ্য, গত ১২ই জুন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম সশরীরে ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার পরিদর্শন করে আয়-ব্যয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৮ই জুন প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজারের শত বছরের পুরনো দানের ৩টি ডেগ সিলগালা করে দিয়ে সরকারি তালাবদ্ধ দানবাক্স ও সশস্ত্র আনসার পাহারার ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে সিলেটের সর্বস্থরের নাগরিকের ব্যানারে আয়োজিত মানব বন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে, যেন অবিলম্বে এই প্রত্যাহার আদেশ বাতিল করা হয়। অন্যথায় তারা রাজপথে হরতালসহ কঠোর কর্মসুচির হুশিয়ারি প্রধান করেন।
#