সিলেট সীমান্তে সমঝোতায় চোরাচালান
দিনে কোটি টাকা রক্ষকের পকেটে

|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবাধে চলছে চোরাচালান। ভারতীয় গরু ও মহিষের পাশাপাশি দেশে ঢুকছে বিভিন্ন ধরনের মসলা, শাড়ি, থ্রিপিস, মোটরসাইকেল ও স্মার্টফোন থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের পণ্য। এসবের আড়ালে ঢুকছে মাদক দ্রব্য এবং আগ্নেয়াস্ত্রও। থেমে নেই মানব পাচারও। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, হুমকিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সিলেট এলাকার চোরাচালানের আদ্যোপান্ত।
চোরকারবারিরা প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্ন করতে টাকার ভাগ দিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের। এদের মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা গড়ে উঠেছে। গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট এবং জৈন্তাপুরের চোরাচালান থেকেই দিনে কোটি টাকার বেশি অর্থ অসাধুদের পকেটে ঢুকছে। ‘সমঝোতা’ ছাড়া যেসব পণ্য ভারত থেকে দেশে ঢুকছে তার একটি অংশ ধরা পড়ছে। এ বছর ২০৬ কোটি টাকার বেশি মাদক ও পণ্যসামগ্রী এবং এক হাজার ২৮১টি গরু বিজিবি আটক করছে। জানা গেছে, যে পরিমাণ পণ্য চোরাচালান হচ্ছে ধরা পড়ছে তার ক্ষুদ্র একটি অংশ।
সিলেটের চোরাচালান নিয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও ক্ষুব্ধ। সম্প্রতি তিনি এক অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘রক্ষকই যদি ভক্ষক হয়, তবে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?’ প্রশাসনের ভেতরে যারা এই ধরনের চোরাই চক্রকে দেখেও না দেখার ভান করে, তাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না। সবাইকে এক মাস সময় দিয়েছি। জুলাইয়েই নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যাবে। এরপরও যারা ঠিক না হবে, আগস্ট থেকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লাইসেন্স বা কাগজপত্রের আড়ালে যারা অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নেয় তাদের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল করা হবে। মন্ত্রণালয়ের ভেতরে যারা চোরাচালানের দালালি করেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা যায়, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট থানা এলাকার ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডাউকি অঞ্চল অবস্থিত। ডাউকি সীমান্ত দিয়েই মূলত অবৈধভাবে গরু ও মহিষের বড় বড় চালান বাংলাদেশে ঢোকে। গোয়াইনঘাটের হাজিগঞ্জ এবং কানাইঘাট এলাকার সুরইঘাট দিয়ে চোরাচালান বেশি হচ্ছে। এছাড়া বিছানাকান্দি ও গোয়াইনঘাট সীমান্তের হাদারপাড় বাজার এবং হরিপুরের দরবস্ত বাজার চোরাচালানের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। রাত ২টা থেকে ভোররাত ৪টা-এই সময়টিকে বেছে নেয় চক্রটি। দিনে বিছানাকান্দি সীমান্ত দিয়ে গড়ে ৫০০ এবং জৈন্তাপুর-দরবস্ত দিয়ে ৩০০ গবাদিপশু অবৈধভাবে ঢোকে। গবাদিপশু বা পণ্য ঢোকানোর জন্য নির্দিষ্ট হারে গুনে গুনে ‘লাইন ফি’ পরিশোধ করতে হয়। প্রতি জোড়া গরুর জন্য একটি বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তাদের দিতে হয় ৩ হাজার টাকা।
প্রতি জোড়া মহিষের জন্য দিতে হয় ৪ হাজার টাকা। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে টাকা দিতে হয় ট্রাকপ্রতি। থানা ও ডিবি পুলিশকেও পৃথকভাবে টাকা দিতে হয়। প্রতিটি গরুর জন্য থানা পুলিশকে এক হাজার ও মহিষের জন্য দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। ডিবি পুলিশকে গরুর জন্য ১০০ টাকা ও মহিষের জন্য ২০০ টাকা দিতে হয়। সীমান্ত দিয়ে মানব পাচারের ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে-রাজবাড়ী, জৈন্তাপুরের মোকামবাড়ী, আলুবাগান, শ্রীপুর, মিনাটিলা, কাঁঠালবাড়ী, কেন্দ্রী মন্দির, রাবার বাগান, ডিবিরহাওড় বিউপি, রিভারপিলার, কলিঞ্জিবাড়ী, জালিয়াখলা, নয়াগ্রাম, নুরুলের টিলা, অভিনাশ, আফিফানগর, বাঘছড়া, তুমইর, জঙ্গিবিল, বালিদাঁড়া, ইয়াংরাজা ও লম্বাটিলা এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত মানব পাচার, ভারতীয় নাছির বিড়ি, মাদকদ্রব্য, জিরা, চিনি থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্য ঢুকছে। প্রতিটি জায়গায় একটি বাহিনীর নিয়োগকরা লাইনম্যানের কাজ করছে রুবেল আহমদ, তাজ উদ্দিন গং, জাকির মিয়া, মাঘাই পাত্র, আব্দুল, রিপন মিয়া ওরফে পিচ্চি রিপন, শাহজাহান ও বুরহান, লিটন মিয়া প্রমুখ। জৈন্তাপুরের বিভিন্ন সীমান্তে ডিবির প্রধান ‘লাইন্সম্যানের’ কাজ করছেন আলামিন। গবাদিপশুর গাড়িগুলো যখন সীমান্ত পার হয়ে দেশের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন চোরাকারবারিদের আশ্বস্ত করে বার্তা পাঠান আলামিন, একটি বার্তায়






