চৌত্রিশ জুলাই : আগুনঝরা দিন
৩ আগস্ট ২০২৪। হাসিনার বাহিনী তখন উন্মত্ত হায়েনা। সিলেটের প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজার থেকে চৌহাট্টা রণক্ষেত্র। পুলিশ, ছাত্রলীগ সমানে ছাত্রজনতাকে ধাওয়া দিচ্ছে, কোপাচ্ছে। নির্বিচার ফায়ারিং চলছে। এমন অবস্থায় আমরা ক’জন নাগরিক আলেমসমাজ এর ব্যানারে দাঁড়িয়ে ছিলাম রাজপথে।
এই নামের জন্ম ঠিক আগের দিন, ২ আগস্ট শুক্রবার। আমাদের কর্মস্থল বশির কমপ্লেক্সের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নামটি প্রস্তাব করে মুতিউল মুরসালিন। দ্বিতীয় ভাবনা ছাড়াই সম্মতি দেই।
১ আগস্ট (বৃহস্পতিবার রাতে) চলমান পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে আমরা একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বসেছিলাম। সেই বৈঠকে জনা দশেক উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিলো, শুক্রবার জুমার পর আমরা আরও বৃহত্তর পরিবেশে বসে কর্মসূচি নির্ধারণ করব। কিন্তু জুমার পরে সেই বৈঠক হয়নি। শুক্রবার বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তাবকারীদের অনেকেও সেদিন সাড়া দিতে পারেননি। জনা দশেক থেকে আমরা হয়ে গেলাম জনা তিনেক!
হাসান ফয়েজ, মুতিউল মুরসালিনকে নিয়ে জুমার পর একটি রেস্টুরেন্টে বসলাম। রেস্টুরেন্টে বসার কিছুক্ষণ পর টের পেলাম কেউ একজন পাশের টেবিলে এসে বসেছে। আমাদের চোখে চোখে রাখছে। তাৎক্ষণিক আমরা সেখান থেকে উঠে এলাম। চায়ের টেবিলে বসেই আমরা ঠিক করেছিলাম, কেউ না আসুক, আমরা একা হলেও রাজপথে নামবো।
বন্ধ মার্কেটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমরা সংগঠনের নাম ঠিক করে ফেললাম। কর্মসূচির নাম দিলাম গণধিক্কার। নাওয়াজ মারজান পোস্টার করে দিলো। কালো থিমে সবুজ মানচিত্র থেকে টগবগে খুন ঝরে পড়ার থিমে, দুর্দান্ত এক পোস্টার হলো ঝটপটে। ইনবক্সে ইনবক্সে দাওয়াত দিতে থাকলাম পরিচিতজনদের। ফেসবুকের টাইম লাইনে সেই পোস্টার ছড়িয়ে পড়লো। গণমাধ্যমগুলো কর্মসূচির আগাম খবর জানান দিল।
আমরা তখনও ভাবছিলাম, আমরাদের পাশে হয়তো কাউকে পাবো না। নির্ধারিত সময়, শনিবার বন্দরবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ পর আমরা কর্মসূচি শুরু করলাম। মুহূর্তেই ব্যানার ছাপিয়ে পুরো রাস্তায় মানুষজন তখন ছড়িয়ে পড়েছেন। সকলেই স্বতস্ফূর্তভাবে কর্মসূচির প্রতি একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশ করেন। গণমানুষের এমন সাড়া আমাদের উজ্জীবিত, অভিভূত করে।
বক্তৃতায় অনভ্যস্ত আমার খালি গলার আওয়াজ তেমন শুনা যাচ্ছিলো না। অন্যদের অভ্যস্ত কণ্ঠস্বর ক্ষোভে বজ্রমুষ্ঠি ছুঁড়ে দিচ্ছিলো। মাতিয়ে রাখছিলো মুতিউলের বক্তৃতা স্লোগান। লেখক মুতিউলের নতুন পরিচয় উন্মোচন হয়। অবশ্য এই ‘পরিচয়ের’ মূল্যও তাকে চুকাতে হয়েছে। যদিও সেটা কল্যাণকরই হয়েছে।
আমাদের কর্মসূচির ওপর হাসিনাবাহিনী যেকোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এই ঝুঁকি ও শঙ্কা মাথায় নিজে একা রাস্তায় নেমে যাওয়া যায়। কিন্তু এতোগুলো মানুষ আমাদের ব্যানারকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়েছে। তাদের নিরাপদ রাখার এক অঘোষিত দায়িত্বভার নিজের কাঁধে অনুভব করছিলাম। এই দায়িত্বভার পুরো আয়োজনে আমাকে এক মুহূর্তও নিশ্চিন্ত থাকতে দেয়নি।
সেদিন বুঝেছি, সুসময়ে ব্যানার নিয়ে মাঠে নামা ও এমন যুদ্ধাবস্থায় কর্মসূচি পালন কতটা বিপদশঙ্কুল ও চ্যালেঞ্জিং। সেই চ্যালেঞ্জ জয়ের তাওফিক আল্লাহ আমাদের দিয়েছিলেন। এইরকম ছোট ছোট ত্যাগ ও শতপ্রাণের কুরবানির বিনময়ে হাসিনার জাহান্নাম থেকে এসেছিলো খুনরাঙা মুক্তি।
নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:০০
  • ১২:০২
  • ৪:৩৬
  • ৬:৩৯
  • ৭:৫৯
  • ৫:২১