ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন সিলেট বিভাগের ৯৫ তরুণ। কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ আবার সুদে ঋণ নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন বিদেশে। লক্ষ্য ছিল ইউরোপে গিয়ে উন্নত জীবন গড়া। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন তাদের অনেকের কাছে দুঃস্বপ্ন। গত দুই মাসে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ৯৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের ৬৬ জন এবং হবিগঞ্জের ২৯ জন।
দেশে ফেরার পর এসব তরুণের অনেকেই ঋণের বোঝা, আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। লিবিয়ায় অবস্থানকালে তাদের কেউ কারাগারে বন্দী ছিলেন, কেউ মাফিয়া চক্রের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আবার কাউকে দালালরা অর্থের জন্য আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছেন। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় তাদের অনেককে দেশে ফিরতে হয়েছে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল লতিফের ছেলে আল আমিন ২০২২ সালে বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। পর্যটন ভিসায় প্রথমে দুবাই যান। সেখানে এক সপ্তাহ থাকার পর লিবিয়ায় পাড়ি জমান। প্রায় সাড়ে তিন বছর লিবিয়ায় কাজ করেন তিনি। কোনো কোনো মাসে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন।
পরে ভৈরবের এক লিবিয়া প্রবাসী দালালের মাধ্যমে সাড়ে ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার চুক্তি করেন আল আমিন। চুক্তির পুরো টাকা দেওয়ার পর একটি বোটে করে তাকে ও অন্যদের সমুদ্রে পাঠানো হয়। প্রায় ৬২ ঘণ্টা সমুদ্রে ভাসার পর লিবিয়ার পুলিশ তাদের আটক করে।
আল আমিনের ভাষ্য, পরে ওই দালাল পুলিশের কাছ থেকে তাদের ছাড়িয়ে আবারও গ্রিসে পাঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু দ্বিতীয়বারও লিবিয়ার পুলিশের হাতে আটক হন তিনি। এরপর এক মাস পাঁচ দিন কারাগারে থাকতে হয় তাকে। পরে আইওএমের মাধ্যমে দেশে ফেরেন।
আল আমিনের মতো গত দুই মাসে সুনামগঞ্জের ৬৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী আইওএমের সহায়তায় দেশে ফিরেছেন। তাদের অনেকেই লিবিয়ায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ইউরোপে যাওয়ার আশায় নিজেরাই দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তারা। কিন্তু সেই পথ শেষ হয়েছে সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে।
দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের খেজাউরা গ্রামের সাইফুল ফজর আলীর অভিজ্ঞতাও ভয়াবহ। তার ভাষ্য, চার বছর আগে সৌদি আরব ও তুরস্ক হয়ে লিবিয়ায় যান তিনি। সেখানে পৌঁছানোর পর দালাল তাকে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। টাকা আদায়ের জন্য ওই চক্র তাকে নির্যাতন করত। তাদের হাত থেকে মুক্তি পেতে দেশে থাকা স্বজনদের মাধ্যমে ১৫ লাখ টাকা দিতে হয়। এরপরও তাকে আরেকটি চক্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সাইফুল বলেন, ওই চক্রটি ‘গেম’ দেওয়ার কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দেওয়ার পর সমুদ্রের পাড়ে লিবিয়ার পুলিশ তাকে আটক করে। পুলিশের কাছ থেকে মুক্তি পেতেও আরও ৫ লাখ টাকা দিতে হয়। পরে আইওএমের মাধ্যমে দেশে ফেরেন তিনি।
জামালগঞ্জের মো. আহাদুল্লাহ চার মাস লিবিয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেছিলেন। তারও স্বপ্ন ছিল ইউরোপে যাওয়ার। এক দালালের সঙ্গে আট লাখ টাকায় চুক্তি করেন তিনি। প্রথমে তিন লাখ টাকা দিয়ে লিবিয়ায় যান। পরে বাকি পাঁচ লাখ টাকার জন্য দালালরা তাকে আটকে রেখে মারধর করে।
একপর্যায়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান আহাদুল্লাহ। তখন তার কাছে কোনো মোবাইল ফোন ছিল না। কিন্তু দালালরা দেশে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার নির্যাতনের ছবি পাঠিয়ে আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। পরিবারের সদস্যরা তাকে তখনো দালালদের হাতে আটক মনে করে ছবি দেখে ভীত হয়ে পড়েন এবং পাঁচ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। অথচ ততক্ষণে তিনি পালিয়ে এসেছিলেন।
একই উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামের আতাউর রহমানও লিবিয়ায় গিয়ে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন। তার ভাষ্য, পাশের ভীমখালী ইউনিয়নের কলকতা গ্রামের দালাল নজরুল ইসলামের সঙ্গে চুক্তি করে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে সৌদি আরব, মিসর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান তিনি। সেখানে যাওয়ার পর দালাল ‘গেমারকে’ টাকা না দেওয়ায় তাকে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
এরপর মাফিয়া সদস্যরা টাকার জন্য তাকে মারধর ও নির্যাতন করতে থাকে। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে হাসপাতালের চিকিৎসকের সহযোগিতায় দেশটির সেনাবাহিনীর কাছে পৌঁছান আতাউর। সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তাকে দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন।
আতাউর রহমান জানান, লিবিয়ায় যাওয়ার জন্য ১৫ লাখ টাকা সুদে ঋণ করেছিলেন। সেই ঋণের পরিমাণ এখন বেড়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হয়েছে। তবে দালাল নজরুল ইসলাম কোনো টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। আগে যারা তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, তারাও কোনো সমাধান পাননি। এ কারণে তিনিও মামলা করতে সাহস পাচ্ছেন না।
অভিযোগের বিষয়ে নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করেন। তবে আতাউর রহমান নামে কাউকে চেনেন না বলে দাবি করেন। একপর্যায়ে ‘রং নম্বর’ বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সুনামগঞ্জে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের জেলা কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, গত দুই মাসে জেলার ৬৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন। দেশে ফেরার পর তাদের অনেকেই ঋণগ্রস্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। তাদের পুনরেকত্রীকরণের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে ব্র্যাক।
এদিকে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার জানান, গত কয়েক মাসে এ ধরনের ঘটনায় ৭ থেকে ৮টি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোর তদন্ত সিআইডির কাছে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ দালাল দেশের বাইরে অবস্থান করায় তাদের আইনের আওতায় আনা কিছুটা জটিল হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, প্রতারণার শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করে মামলা করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়ার পর আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দোষীদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে।
বিদেশে গিয়ে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা করা এসব তরুণের অনেকেরই এখন দেশে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করার লড়াই। দালালদের প্রতারণা, নির্যাতন ও বিপুল ঋণের বোঝা তাদের সেই পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে।



