শিশুদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ক্ষতিকর এমন অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের করা মামলার নিষ্পত্তিতে ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতায় রাজি হয়েছে মেটা। বুধবার ঘোষিত এই সমঝোতা প্রযুক্তি খাতকে ঘিরে চলমান শিশু নিরাপত্তা বিতর্কে বড় ধরনের মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মামলাটি মূলত শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তা নিয়ে। প্রায় ৩০ বছর পুরোনো যুক্তরাষ্ট্রের চিলড্রেন’স অনলাইন প্রাইভেসি প্রোটেকশন অ্যাক্ট (সিওপিপিএ)-এর আওতায় ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে মামলাটি করা হয়।
তবে আইনি লড়াইটি কেবল তথ্যের গোপনীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের জন্য কতটা নিরাপদ, সে বিষয়েও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
মামলাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য অংশ নেয়, যা দেশটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে বলে ধারণা করা হলেও মাত্র পাঁচ দিনের শুনানির পরই মামলাটি সমঝোতায় শেষ হয়। এমনকি মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে সাক্ষ্য দেওয়ার আগেই শুনানি শেষ হয়ে যায়।
মেটার জন্য মামলাটি বেশ কঠিন হয়ে উঠেছিল। সাবেক ইনস্টাগ্রাম কর্মী ও হুইসেলব্লোয়ার আর্তুরো বেজার অভিযোগ করেন, শিশুদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সময় ক্ষতিকর কনটেন্টের বিষয়টি তিনি অতীতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আরেক নির্বাহীকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি মনে করতে পারেননি, একটি প্রেজেন্টেশনে মেটা কখনো কখনো নিয়ম পরিবর্তনের বদলে জরিমানা দেওয়াকেই বেছে নেয় এমন কথা লেখা হয়েছিল কি না।
এ ছাড়া মেটার অভ্যন্তরীণ নথিতেও দেখা যায়, ব্যবহারকারীদের স্বেচ্ছায় চালু করতে হয় এমন নিরাপত্তা সুবিধাগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কম হতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানত। তারপরও কিছু নিরাপত্তা ফিচার ডিফল্টভাবে চালু না করেই বাজারে আনা হয়েছিল।
মামলায় হেরে গেলে মেটাকে শত শত বিলিয়ন ডলার জরিমানা গুনতে হতে পারে বলে ব্যাপক আলোচনা ছিল। সর্বোচ্চ সম্ভাব্য জরিমানার একটি হিসাব ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার যা প্রায় মেটার পুরো বাজারমূল্যের সমান। যদিও এমন জরিমানা বাস্তবে হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম, তবুও সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কয়েক শ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
সেই তুলনায় ১০ বছরে ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা মেটার জন্য অনেক কম ব্যয়ের। তবে প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের অন্যায় করার কথা স্বীকার করেনি।
সমঝোতার অংশ হিসেবে শিশু ও কিশোরদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে রাজি হয়েছে মেটা। এর মধ্যে রয়েছে কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য উভয় প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে দৈনিক দুই ঘণ্টার ডিফল্ট সময়সীমা। তবে সরাসরি বার্তা আদান-প্রদানের সময় এই সীমার মধ্যে গণনা করা হবে না।
এ ছাড়া রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত এবং স্কুল চলাকালে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত কিশোরদের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা হবে। পোস্ট ও কনটেন্টে পাওয়া ‘লাইক’ সংখ্যাও কিশোরদের জন্য পুরোপুরি গোপন রাখা হবে।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে এসব সুবিধার বেশিরভাগই ডিফল্টভাবে চালু অথবা কিশোরদের জন্য ব্যবহারের বিকল্প হিসেবে দেওয়া হবে। শিশু ব্যবহারকারীদের আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত করার নতুন ব্যবস্থাগুলো চালু করতে অবশ্য এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের সুরক্ষায় এসব পরিবর্তন আরও আগেই আসা উচিত ছিল। মেটার নতুন উদ্যোগ শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শিশুদের ওপর প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ায় অন্যান্য দেশও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো যেমন টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাট এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মেটার পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্মগুলো একই ধরনের পদক্ষেপ না নিলে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিশুদের সুরক্ষায় পুরোপুরি কার্যকর হবে না।
তবে এসব পরিবর্তনের ফলে কিশোরদের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণ কতটা থাকবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। প্ল্যাটফর্মগুলো যদি শিশুদের জন্য অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত হয়ে যায়, তাহলে তারা আদৌ আগের মতো এগুলো ব্যবহার করবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
সাবেক ইনস্টাগ্রাম প্রকৌশলী ও হুইসেলব্লোয়ার আর্তুরো বেজারের মতে, মেটার নতুন উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ফলাফলের ওপর। তার ভাষায়, ‘শেষ পর্যন্ত মেটাকে প্রচেষ্টার জন্য নয়, ফলাফলের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’



