৭ মাসে ১০ মৃত্যু

টাঙ্গুয়ার হাওরে নিরাপত্তাহীন হাউসবোট, পরিবেশ দূষণে বিপন্ন হাওর

টাঙ্গুয়ার হাওরে নিরাপত্তাহীন হাউসবোট, পরিবেশ দূষণে বিপন্ন হাওর

একপাশে মেঘালয়ের পাহাড়, অন্যপাশে হিজল-করচের বন। আর মাঝখানে দিগন্তজোড়া স্বচ্ছ জলরাশি। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের আধার সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট ও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষিত এই জলাভূমি একসময় ছিল জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, নিরাপত্তাহীন হাউসবোট, বেপরোয়া নৌযান চলাচল, প্লাস্টিক ও মানববর্জ্য এবং উচ্চশব্দের কারণে সেই টাঙ্গুয়ার হাওর এখন ক্রমেই হয়ে উঠছে পর্যটনের নামে মৃত্যুফাঁদ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৭ মাসে ১০ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

ম্প্রতিক সময়ে হাউসবোট থেকে পড়ে দুই পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় হাওরের পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে গত শুক্রবার মধ্যনগর থেকে যাদুকাটার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে দক্ষিণকুল বৌলাই নদীতে চলন্ত ‘সাফিনা এ লাক্সারী ওয়াটার ভিলা’ হাউসবোট থেকে পড়ে ১০ বছরের শিশু রুকাইয়া নূরের মৃত্যু হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে এসে পানিতে ডুবে মারা যান রাজশাহী জেলার শাহমখদুম উপজেলার মধ্যনওদাপাড়া গ্রামের নূর ইসলামের ছেলে কলেজছাত্র আব্দুল মাজেদ পিকলু।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টাঙ্গুয়ার হাওর ও আশপাশের নদ-নদীতে প্রায়ই নৌকাডুবি, পানিতে পড়ে মৃত্যু, হাউসবোটের যন্ত্রে কাটা পড়া এবং নৌযানের সংঘর্ষের মতো দুর্ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তাহিরপুরে মানিক মিয়া (২১), ২৪ এপ্রিল সুফিয়ান (১৪), ২৯ মে ওবায়দুল (৬), ৩১ মে তামিম ইসলাম (১৫), ৫ জুন নিঝুম (৮), ৯ জুন সুলতানা বেগম (২৪), ১০ জুন আমিন মিয়া (২৩), ২২ জুন রুবেল মিয়া (৩০), ৭ আগস্ট আলী আকবর খান এবং ২১ আগস্ট কাশেম মিয়ার মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া গত ২৫ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গুয়ার হাওরগামী পর্যটকবাহী ‘মাছরাঙা’ হাউসবোটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই সময় হাউসবোটে কোন পর্যটক না থাকায় বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

বাড়ছে হাউসবোট, বাড়ছে ঝুঁকি :
পর্যটন মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোটের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে হাওরে ২০০টির বেশি হাউসবোট চলাচল করছে। পর্যটন মৌসুমে হাওরের বিভিন্ন অংশে সারি সারি হাউসবোট অবস্থান করতে দেখা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক হাউসবোট নির্ধারিত নৌপথ অনুসরণ না করে হাওরের বুক চিরে চলাচল করছে। এতে হাওরের জলজ উদ্ভিদ, মাছ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি হাউসবোটে উচ্চশব্দে গান-বাজনা, মাইক ও জেনারেটরের ব্যবহার এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক ও মানববর্জ্য ফেলার কারণে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

সবচেয়ে বড় সংকট উদ্ধার ব্যবস্থায় :
টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটন নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা দিয়েছে জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থায়। হাওরবেষ্টিত তাহিরপুর উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও জনবল থাকলেও সেখানে ডুবুরি নেই। ফলে পানিতে ডুবে যাওয়া বা নিখোঁজের ঘটনায় সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে ডুবুরি দল আসার অপেক্ষায় থাকতে হয়।

স্থানীয়রা জানান, জেলা সদর থেকে ঘটনাস্থলে ডুবুরি দল পৌঁছাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। অথচ পানিতে ডুবে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিটই একজন মানুষের জীবন রক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তাহিরপুরে দ্রুত ডুবুরি দল, উদ্ধারকারী নৌযান ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন হাওর এলাকার মানুষ।

১৩ দফা নির্দেশনা কতটা কার্যকর?
টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, প্রতিবেশগত ভারসাম্য ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত ২ আগস্ট জেলা প্রশাসন দ্বিতীয় দফায় ১৩টি নির্দেশনা জারি করে। একই সঙ্গে হাওরে লাল নিশানা উড়িয়ে সতর্কতা জারি করা হয়।
নির্দেশনায় হাউসবোট নিবন্ধন, পর্যটকদের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত টাঙ্গুয়ার হাওরের ইসিএ ঘোষিত সীমানায় সব ধরনের হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানের প্রবেশ ও চলাচল বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া হাউসবোটে উচ্চস্বরে গান-বাজনা, মাইক বা পার্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহনেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

প্রতিটি নৌযানে পানি বিশুদ্ধকারী ফিল্টার, সেপটিক ট্যাংক ও অন্তত দুটি ডাস্টবিন রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হাওর বা জলাশয়ে কোনো ধরনের বর্জ্য না ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাউসবোটের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১০০ ফুটের মধ্যে রাখা, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও নিরাপদ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নির্দেশনাও রয়েছে। পর্যটকদের জন্য আচরণবিধি দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন, ট্যুর শুরুর আগে তা জানানো এবং জরুরি প্রয়োজনে প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতালের যোগাযোগ নম্বর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পর্যটক পরিবহন নিষিদ্ধের পাশাপাশি আকস্মিক ঝড়, প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাতের আশঙ্কায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে এত নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে এর অনেকটাই মানা হচ্ছে না। মাঝে মধ্যে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হলেও অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও আগের চিত্র ফিরে আসে।

রামসার স্বীকৃতির হাওর আজ হুমকির মুখে :
তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার প্রায় ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর ২০০০ সালের ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমি হিসেবে রামসার সাইটের স্বীকৃতি পায়। মিঠাপানির মাছ, জলজ উদ্ভিদ এবং দেশি-বিদেশি পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে আন্তর্জাতিক ভাবে এই হাওরের গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, হাউসবোটের সংখ্যা বৃদ্ধি, উচ্চশব্দ, প্লাস্টিক ও মানববর্জ্য, জেনারেটরের ব্যবহার এবং নির্ধারিত নৌপথের বাইরে নৌযান চলাচলের কারণে হাওরের প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।

প্রকৃতি দেখতে এসে যদি পর্যটকের জীবনই অনিরাপদ হয়ে পড়ে, আর আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি যদি পর্যটনের চাপে ধ্বংসের পথে যায়—তাহলে প্রশ্ন উঠছে, এই পর্যটন কার জন্য, আর কাদের স্বার্থে? পর্যটনকে টেকসই ও নিরাপদ করতে শুধু নির্দেশনা জারি নয়, এর কঠোর বাস্তবায়ন, হাউসবোটের নিবন্ধন ও নিয়মিত তদারকি, নির্ধারিত নৌপথ নিশ্চিতকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং তাহিরপুরে স্থায়ী ডুবুরি দল ও আধুনিক উদ্ধার ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, “আমরা হাওরে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি এবং জরিমানা করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাউসবোটসহ আগত পর্যটকদের সচেতন করতে লিফলেট বিতরণ ও প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:১৪
  • ১১:৫৮
  • ৪:২৮
  • ৬:২২
  • ৭:৩৮
  • ৫:৩০