সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র শুরুর দিনগুলোতে সিলেটে দলটির রাজনীতি গুছিয়ে তোলার মূল কারিগরদের একজন ছিলেন আবুল হারিছ চৌধুরী। তিনি ছিলেন সিলেট জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন প্রথম সাধারণ সম্পাদক। পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান, ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান এবং চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দেশজুড়ে তুমুল প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। আগামীকাল তাঁর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৪ বছর অন্তরালে থেকে ২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার অজ্ঞাত স্থানে মারা যান তিনি।
রাজনীতির যে মাঠ থেকে হারিছ চৌধুরীর উঠে আসা, জীবনের শেষভাগে এসে সেই রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে তাঁর নাম হয়ে ওঠে এক অমোচনীয় রহস্যের প্রতীক। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর তাঁর আকস্মিক অন্তর্ধান আর দীর্ঘ ১৪ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এবং মৃত্যুর খবর নিয়ে তৈরি ধোঁয়াশা—সব মিলিয়ে এক ট্র্যাজিক চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন তিনি।
তৃণমূল থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ ও ক্ষমতার কেন্দ্র পৌঁছা সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার দিঘিরপাড় পূর্ব ইউনিয়নের দর্পনগর গ্রামে জন্ম নেওয়া হারিছ চৌধুরী পড়াশোনা করেন ঢাকার নটরডেম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুরুতে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকলেও ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের আহ্বানে জাগদলে যোগ দেন।
পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলে সিলেট জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে তরুণ বয়সেই সিলেটের রাজনীতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেন হারিছ। এরপর যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, সহসভাপতি, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম মহাসচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হলেও ১৯৯১ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী এবং ২০০১ সালে ক্ষমতা পাওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক সচিব নিযুক্ত হন তিনি। তৎকালীন সরকারের ক্ষমতার অন্যতম ভরকেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’-এর ঘনিষ্ঠ ও তারেক রহমানের আস্থাভাজন হওয়ায় প্রশাসনের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের একজনে পরিণত হয়েছিলেন হারিছ চৌধুরী।
নিখোঁজ থেকে পলাতক জীবন
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের তালিকায় নাম ওঠে হারিছ চৌধুরীর। যৌথ বাহিনী তাঁর ঢাকার ও সিলেটের বাসভবনে ঝটিকা অভিযান চালালেও তাঁর হাদিশ পায়নি। এরপর তিনি চলে যান আত্মগোপনে।
সেই থেকে প্রায় ১৪ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকেন সিলেট বিএনপির এই প্রবীণ প্রতিষ্ঠাতা নেতা। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাসহ একাধিক মামলায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই সাজা হয়। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ১৪ বছর তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি।
বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে চাউর হয়, ২০০৭ সালের ২৯ জানুয়ারি জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান তিনি। সেখান থেকে আসাম, পরবর্তীতে ইরান হয়ে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে পরিবারে যোগ দেন। কিন্তু এইসব দাবির সামনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঢাকার অজ্ঞাত স্থানে তার মৃত্যু ও দাফন নিয়ে।
সিলেটে কোনো কর্মসূচি নেই
হারিছ চৌধুরীর অন্তর্ধান ও মৃত্যুর পর তার দল বিএনপি এখন ক্ষমতায়। দলটি আড়ম্বরে পালন করছে ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সারাদেশের মতো সিলেটেও পালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। কিন্তু সিলেট বিএনপির প্রথম সাধারণ সম্পাদক হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকীতে দলীয় কোনো কর্মসূচি নেই সিলেট বিএনপির।
সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন আমার সিলেটকে বলেন, হারিছ চৌধুরী ছিলেন আমার রাজনৈতিক জীবনের প্রেরণা। তাকে আমরা হৃদয়ের গভীর থেকে স্মরণ করি। শ্রদ্ধা করি। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে কোনো কর্মসূচি আছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখনও নেই।



