জুলাই বিপ্লবে ভারতে পালিয়ে যাওয়া পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ডান হাত ছিলেন তিনি। ছিলো আইজিপি হবার খুব খায়েশ। সেই খায়েশ পূরণে বিরোধী কণ্ঠকে দমন আর নির্যাতনে বহু কাটি সরেস ছিলেন এক পুলিশ কমিশনার। ১৭ বছরের ভয়াবহ দুঃশাসনের ভিতরে পুলিশে ‘ব্র্যান্ড গোপালগঞ্জ’ বানিয়ে ছিলেন এই ধূর্ত এবং ক্ষমতা লোভী কর্মকর্তা। জুলাই বিপ্লবকে বন্দুকের নলে থামিয়ে দিতে হতে চেয়েছিলেন পুলিশের বড় কর্তা। তার আর হয়নি। আমার সিলেট-এ ‘ভয়ংকর পুলিশ’ নিয়ে ধারাবাহিক সিরিজের পর্ব-২ এর আলোচিত দুর্নীতিপরয়ান এবং নিপীড়ক পুলিশ কর্মকর্তা হলেন সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান। পাঠকদের সামনে তার নিপীড়ন এবং শোষণের চিত্র নিচে তুলে ধরা হল:
ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ছিলেন স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের ডান হাত। কেবলমাত্র আইজিপি হওয়ার খায়েশ নিয়ে বিরোধী দল দমন নিপীড়নে ক্ষমতা প্রদর্শন করেছিলেন এই পুলিশ অফিসার। এছাড়া পুলিশে নিয়োগ, বদলি এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে শত শত কোটি টাকা আয় করেছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান। মহাক্ষমতাধর পুলিশ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান সাভার, গাজীপুর এবং কেরানীগঞ্জে জমি ও মার্কেট দখল, চাঁদাবাজি, বেনামে ব্যবসা এবং মামলার মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিপুল সম্পদ সংগ্রহ করেছেন। পলাতক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এলাকার লোক ও আস্থাভাজন হওয়ার কারণে তিনি সবসময় গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন। এ ছাড়া ছাত্র-জনতার যৌক্তিক আন্দোলন গুলি-হামলা চালিয়ে থামাতে চেয়েছিলেন বলে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রথমপর্ব
হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার সহযোগি ছিলেন আইজিপি মামুন
কমিশনার হাবিবুর রহমান ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা সাজিয়ে এক হাজার লোককে পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এই নিয়োগ হয়েছে ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে। নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশের বাড়ি ছিল গোপালগঞ্জ ও তার আশপাশের এলাকায়। বড় ধরনের এসব জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন পতিত শেখ হাসিনা বা গোপালগঞ্জের পুলিশ বলে পরিচিত সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান।
হাবিবুর রহমান গোপালগঞ্জের বাসিন্দা। তার বাড়ি সদর উপজেলার চন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামে। গোপালগঞ্জের চন্দ্রদিঘলিয়া মোল্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করে গোপালগঞ্জের এসএম মডেল গভর্নমেন্ট হাই স্কুল ও সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজে তিনি পড়াশোনা করেন। লেখাপড়া শেষ করে গোপালগঞ্জে একটি জাতীয় দৈনিকের স্থানীয় সংবাদদাতা হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল পিএসসির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী বা কেরানি হিসেবে। অভিযোগ রয়েছে, অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে, গোপালগঞ্জ কানেকশন এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি পিএসসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে লিয়াজোঁ করে বিসিএস পরীক্ষা দেন। ১৯৯৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি যোগ দেন বাংলাদেশ পুলিশে। তিনি ১৭তম বিসিএসের কর্মকর্তা।
পুলিশে ছিল ‘ব্র্যান্ড গোপালগঞ্জ’। এই ব্র্যান্ডের মধ্যে কিশোরগঞ্জ, শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও মাদারীপুরের বাসিন্দারাও ছিলেন। গত সাড়ে ১৫ বছরের পুলিশের যত নিয়োগ হয়েছে তার একটি বড় অংশ গোপালগঞ্জের বাসিন্দা। এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ এবং দলটির অঙ্গ সংগঠনের সদস্য। বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিশেষ একটি সিন্ডিকেট করে গোপালগঞ্জের বাসিন্দাদের জালিয়াতের মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে সারা দেশের বিভিন্ন জেলার কোটায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগে বিশেষ এজেন্ডার পাশাপাশি হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। আর এটি হয়েছে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের যোগসাজশে।
গোপালগঞ্জে ওসি হবার পর কমিশনার হাবিব সরাসরি ঘুষের মাসোহারা নিতে স্বস্তিবোধ করতেন এমন বলেছেন একাধিক ওসি। হাবিবুর রহমান ডিএমপি কমিশনার থাকাবস্থায় বিরোধীদল বা ভিন্নমতকে দমনে নিজের সর্বোচ্চটাই দিয়েছেন। আইজিপি হওয়ার খায়েশে শেখ হাসিনাকে তুষ্ট করতে এমনটাই করেছিলেন তিনি। হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জন করলেও তা সুকৌশলে বিদেশে পাচার করেছেন এবং দেশে বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে রেখেছেন।
রাজধানীর শান্তিনগরের সান টাওয়ারের আইএসপি প্রতিষ্ঠান অন্তরঙ্গ। এতে বিনিয়োগ রয়েছে-সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের। তিনি ইন্সপেক্টর নাজমা আক্তারের মাধ্যমে যুক্ত হন। আসাদুজ্জামান-নাজমা দম্পতির চট্টগ্রামের গাড়ি ব্যবসারও আসল মালিক হাবিবুর রহমান। সাভার বাসস্ট্যান্ডের রূপকথা মার্কেট দখলেরও অভিযোগ রয়েছে হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। পুলিশের মাধ্যমে দখল নিয়ে ভাড়া তুলছিলেন তিনিই। সাভারের বেদেপল্লিতে চাঁদাবাজির অভিযোগ মিলেছে তার বিরুদ্ধে। কবরস্থান করার নামে জোর করে জমি কিনেছেন হাবিব। তিনি পালানোর পর গার্মেন্টেস ওয়াশিং প্লান্টটি বেদখল হয়েছে।
ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও নারীঘটিত অপকর্মেরও অভিযোগ আছে। শুধু তাই নয়, এই হাবিবুর রহমানের কাছে দাঁড়িওয়ালা, টুপিওয়ালা কোনো পুলিশ অফিসার যেতে পারতেন না। পুরোদস্তুর ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন কমিশনার হাবিবুর রহমান। পুলিশ বিভাগে নতুন পন্থায় ঘুষ নেওয়ার সিস্টেম চালু করেন কমিশনার হাবিবুর রহমান।
জুলাই বিপ্লবের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুলে আনাসসহ ৬ জনকে হত্যার অভিযোগে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এ বছরের ২৬ জানুয়ারি ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
হাবিবুর এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যাংক হিসাবে সব ধরনের লেনদেন স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। একই সঙ্গে তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবও স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বৈতনিক হিসাব এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না। বিএফআইইউ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে ব্যাংক হিসাব স্থগিতের এ নির্দেশনা দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠিয়েছে।
২০২৪ সালের ৭ আগস্ট হাবিবুর রহমানকে ডিএমপি কমিশনারের পদ থেকে বদলি করে পুলিশ অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। এরপর ১৩ আগস্ট তাকে চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়।
কোটাবিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীতে সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। জুলাই-আগস্টের এই আন্দোলনের সময় ঢাকায় কয়েক শ মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং এসব মৃত্যুর সিংহভাগের জন্য পুলিশকে দায়ী মনে করা হয়। গত ৫ আগস্ট গণ–আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর হাবিবুর রহমানকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তীব্র জনরোষের মুখে এই কর্মকর্তা ভারতে পালিয়ে যান।



