বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন সচেতনতা, পোশাকের স্থায়িত্ব এবং পরিবেশগত কারণে প্রাকৃতিক তুলা বা কটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমএফ) বা কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের দিকে ঝুঁকছেন বৈশ্বিক পোশাক ক্রেতা ও বড় ব্র্যান্ডগুলো। কিন্তু এতদিন এ প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে ছিল তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। কারণ, সুতি কাপড়ের ওপর ভিত্তি করেই দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বিস্তার।
কৃত্রিম তন্তুর আধিপত্যে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু হাল আমলে কটননির্ভরতা কমিয়ে কৃত্রিম তন্তুর দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন উদ্যোক্তারা। এতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া খাতটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স ফেডারেশনের (আইটিএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত পোশাকের ৭৮ শতাংশই কৃত্রিম তন্তুর আর তুলার তৈরি পোশাক মাত্র ২২ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সিংহভাগ (প্রায় তিন-চতুর্থাংশ) তুলার তৈরি হলেও পরিবর্তিত বৈশ্বিক চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে কটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃত্রিম তন্তুর সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন পোশাক উদ্যোক্তারাও।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিটওয়্যার ও ওভেন গার্মেন্টস মিলিয়ে মোট রপ্তানিতে তুলাভিত্তিক পণ্যের অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছিল ৭২.৫ শতাংশ, আর কৃত্রিম তন্তুর পণ্যের অংশ ছিল ১৬.২ শতাংশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে এসে সেই হিসাব বদলে গেছে। তুলাভিত্তিক পণ্যের অংশ নেমে এসেছে ৬৯.৫ শতাংশে, আর কৃত্রিম তন্তুর পণ্যের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯.৭ শতাংশে। দুই মাসেই কৃত্রিম তন্তুর অংশ বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ। টাকার হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ৬০৩ কোটি ডলারের, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই সেই গড় আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি ডলারে। মাসিক গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩৯ শতাংশ। একই সময় তুলাভিত্তিক পণ্যের মাসিক গড় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। অর্থাৎ, কৃত্রিম তন্তুর পণ্য বাড়ছে তুলার তুলনায় প্রায় চারগুণ দ্রুতগতিতে।
এই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি নিটওয়্যার খাত। নিটওয়্যারে কৃত্রিম তন্তুর পণ্যের অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দাঁড়িয়েছে ২২ শতাংশে। বিপরীতে ওভেন গার্মেন্টসে কৃত্রিম তন্তুর অংশ প্রায় অপরিবর্তিত। এখানে ১৬.৯ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ১৬.৪ শতাংশ হয়েছে। একক পণ্য হিসেবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে কৃত্রিম তন্তু নিটেড জার্সি ও পুলওভার-জাতীয় পণ্য। জুলাই-আগস্টেই জার্সি রপ্তানির মূল্য ছিল প্রায় ৬১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এরপর রয়েছে সিনথেটিক ফাইবারের প্যান্ট, জ্যাকেট-ব্লেজার এবং শার্ট-জাতীয় পণ্য।
ইপিবির সামগ্রিক প্রতিবেদন অনুযায়ী জুলাই-আগস্টে তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.১ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে নিটওয়্যারের প্রবৃদ্ধি ৬.২ শতাংশ, যা ওভেনের চেয়ে ৩.৮ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি কাঁচামাল হিসেবে ম্যান-মেড ফিলামেন্ট ও স্ট্যাপল ফাইবারের আমদানি-রপ্তানির হিসাবে পোশাকশিল্পে সিনথেটিক কাঁচামালের ব্যবহার বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
পোশাকের ধরন, ব্যবহার ও ভোক্তার চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে এসব ফাইবারের ব্যবহারও বাড়ছে। ফলে প্রচলিত কটনভিত্তিক পোশাকের পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তুনির্ভর পণ্যের বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, তৈরি পোশাকশিল্পে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যান-মেড ফেব্রিক্স বা কৃত্রিম কাপড়ের ব্যবহারও বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। রাসায়নিক উপাদান, পেট্রোলিয়ামজাত কাঁচামাল এবং উদ্ভিজ্জ সেলুলোজ থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এসব ফাইবার তৈরি করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে পলিয়েস্টার। তাদের মতে, পোশাকের ধরন ও ব্যবহারের বৈচিত্র্য বাড়াতে কৃত্রিম তন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আরাম, স্থায়িত্ব, রঙ ধারণের সক্ষমতা ও বিভিন্ন ধরনের ফেব্রিক তৈরির সুবিধার কারণে বিশ্ববাজারে এসব ফাইবারের চাহিদা বাড়ছে। ফলে প্রচলিত তুলাভিত্তিক পোশাকের পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তুনির্ভর পণ্যের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি আবু তৈয়ব বলেন, দিন দিন ম্যান-মেইড ফাইবারের পোশাক রপ্তানি আরো বাড়বে। এ ধরনের পোশাকের জন্য কাঁচামাল চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আনতে হয় বলে খরচও বেশি। তিনি জানান, ভিয়েতনামের পোশাক ও বস্ত্র খাতে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এতে তাদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বাড়িয়েছে। এ খাতে পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকারকেও প্রণোদনার মাধ্যমের ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করতে হবে। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হতে হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পোশাকে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্ববাজারের সঙ্গে উদ্যোক্তারা তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কৃত্রিম তন্তুতে পোশাক তৈরির উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। সাধারণত স্থানীয় উদ্যোক্তারা এই ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তিনি জানান, কৃত্রিম তন্তু উৎপাদন খাতে বিনিয়োগকারীদের ব্যাংক লোনের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে হবে। কৃত্রিম তন্তুর বিষয়ে সরকার পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিয়ে এগোলে দেশের তৈরি পোশাক খাত পরিবর্তিত বাজারেও ভালো করবে। সরকারকে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিআই) বিষয়ে তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ ও অঞ্চলে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়, তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি বাড়াতে হবে। যাতে সহজ শর্তে রপ্তানি করা যায়। এ খাতে আমাদের অবশ্যই সমৃদ্ধি আনতে হবে। অন্যথায় বাজারে যে প্রতিযোগীরা আছে, তাদের দখলে চলে যাবে আমাদের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম প্রধান এই খাত।
কৃত্রিম তন্তু উৎপাদনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান টিকে গ্রুপের মডার্ন সিনটেক্স লিমিটেড। টিকে গ্রুপের পরিচালক মোস্তফা হায়দার বলেন, ফ্যাশনের জগতে দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুনত্ব আসছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে আমরাও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আগামীতে জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে হলে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সেক্ষেত্রে কটনের চেয়ে কৃত্রিম তন্তুর দিকে মনোযোগ দেওয়ার বিকল্প নেই। সরকার চলতি বাজেটে কিছু বিষয় অ্যাড্রেস করেছে, আরো কিছু নীতিগত বিষয় আছে। ধীরে ধীরে সেগুলো বাস্তবায়ন হলে বৈচিত্র্যময় ফ্যাশনের বাজারে আমরাও প্রতিযোগিতা করতে পারব।



