সিলেটের আলোচিত শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যা রায়ের ৯ বছরেও আপিল নিষ্পত্তি হয়নি

সিলেটের আলোচিত শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যা রায়ের ৯ বছরেও আপিল নিষ্পত্তি হয়নি

২০১৫ সালের ৮ জুলাই। সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চুরির অভিযোগ তুলে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজনকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। নির্যাতনের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করেন হত্যাকারীদের একজন। পরে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। দ্রুত তদন্ত শেষে বিচারিক আদালতে মামলার বিচার শেষ হয় মাত্র ১৭ কার্যদিবসে।

নিহত রাজনের বাড়ি সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী (বাদেয়ালি) গ্রামে। কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি এলাকায়।

কিন্তু সেই দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে গড়ায়নি। বিচারিক আদালতের রায়ের পর হাইকোর্টে চার আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল হয় ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল। এরপর মামলাটি যায় আপিল বিভাগে। হাইকোর্টের রায়ের পর প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও মামলা এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রাজন হত্যা মামলাকে প্রায় নয় বছর ধরে আপিল বিভাগে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যে মামলার বিচারিক আদালতে কার্যক্রম শেষ হয়েছিল ১৭ কার্যদিবসে, সেই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে প্রায় এক দশক।

হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুত তদন্ত শুরু করে পুলিশ। ২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট ১৩ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে মামলাটি সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচার শুরু হয়।

১৭ কার্যদিবসের বিচার শেষে ওই বছরের ৮ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন আদালত। চার আসামি কামরুল ইসলাম, ময়না চৌকিদার, তাজউদ্দিন আহমদ বাদল ও পলাতক জাকির হোসেন পাভেল আহমদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

কামরুলের সহযোগী নূর মিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং কামরুলের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ও শামীম আহমদকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দুলাল আহমদ ও আয়াজ আলীকে দেওয়া হয় এক বছর করে কারাদণ্ড। মামলায় অভিযোগপত্রে ১৩ জন আসামি থাকলেও বিচারিক আদালতে ১০ জনের সাজা হয় এবং তিনজন খালাস পান।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স যায় হাইকোর্টে। একই সঙ্গে কয়েকজন আসামি আপিল করেন।

২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয়। ১৯ কার্যদিবসে শুনানি শেষ হয়। পরে ১১ এপ্রিল রায়ের দিন ধার্য করা হয়।

সেদিন হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের চার আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তিন আসামির সাত বছর করে এবং দুই আসামির এক বছর করে কারাদণ্ডও বহাল থাকে। তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া নূর মিয়ার সাজা কমিয়ে ছয় মাস করা হয়।

হাইকোর্টের রায়ের পর রাজনের বাবা শেখ মো. আজিজুর রহমান আলম বলেছিলেন, তিনি রায়ে সন্তুষ্ট এবং দ্রুত আসামিদের দণ্ড কার্যকর দেখতে চান।

রাজন হত্যার পর থেকে তার মা লুবনা আক্তার ছেলের হত্যার বিচার দাবি করে আসছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমার পুয়া (ছেলে) চোর না। এ কথা সারা এলাকার মানুষ জানে। আমি ছেলে হত্যার উচিত বিচার চাই।’’

ছেলের হত্যার বিচার নিয়ে রাজনের বাবা-মায়ের সেই অপেক্ষা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল হওয়ার পরও সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত ধাপ শেষ না হওয়ায় দণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়াও এগোয়নি।

হাইকোর্টের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পক্ষ থেকে আপিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে মামলাটি যায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে।

২০১৭ সালের হাইকোর্টের রায়ের পর ২০২২ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পাঁচ বছরেও আপিল বিভাগে মামলাটির চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়নি। তখন মামলাটি শুনানির অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

এরপরও সময় গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রাজন ও খুলনার শিশু রাকিব হত্যা মামলাকে প্রায় নয় বছর ধরে আপিল বিভাগে ঝুলে থাকা মামলার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এত দীর্ঘ সময় ধরে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত শুনানি না হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো একক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে মামলার বর্তমান অবস্থান ও বিলম্বের কারণ জানতে আদালতের সর্বশেষ কার্যতালিকা ও নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

রাজন হত্যার পর মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুত এগোলেও ঘটনার শুরুতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। রাজনের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা গ্রহণে বিলম্ব, পরিবারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং মূল আসামি কামরুল ইসলামকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

এসব অভিযোগের পর জালালাবাদ থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) আক্তার হোসেন, এসআই জাকির হোসেন ও এসআই আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

তবে এসব অভিযোগ রাজন হত্যা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দেওয়া ফৌজদারি দণ্ডের বিষয় থেকে আলাদা। হত্যার বিচার এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় অভিযোগকে তাই পৃথকভাবে দেখতে হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর মামলার অন্যতম প্রধান আসামি কামরুল ইসলাম সৌদি আরবে পালিয়ে যান। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নির্যাতনের ভিডিও দেখে তাকে শনাক্ত করা হয়। প্রবাসীদের সহযোগিতায় সৌদি আরব থেকে তাকে আটক করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরই রাজন হত্যা জাতীয়ভাবে আলোচিত হয়ে ওঠে। জনমতের চাপ এবং দ্রুত তদন্তের ফলে একে একে আসামিরা গ্রেপ্তার হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিশু নির্যাতন ও হত্যার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদও হয়।

রাজন হত্যার বিচারিক আদালতের রায় হয়েছিল হত্যাকাণ্ডের মাত্র চার মাসের মধ্যে। হাইকোর্টেও ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষ হয়েছিল ২০১৭ সালে। কিন্তু এরপর সর্বোচ্চ আদালতের ধাপে এসে মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

রাজনের বাবা শেখ মো. আজিজুর রহমান আলম বলেন, তার ছেলে রাজনকে যারা নির্মমভাবে হত্যা করেছেন, তাদের বিচার আদালত করেছেন। হাইকোর্টও মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। কিন্তু এত বছর পার হয়ে গেলেও মামলাটি শেষ হয়নি। তিনি চান, আপিল বিভাগ দ্রুত মামলাটির নিষ্পত্তি করুক। ছেলের হত্যার বিচার পুরোপুরি শেষ হয়েছে এটা দেখতে চান।

তিনি বলেন, ‘‘আমি প্রতিনিয়ত হাইকোর্টে যাই কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথার উত্তর দিচ্ছে না। আমি চাই, আমার ছেলে হত্যা বিচার রায় যেটা হয়েছে, সেটা দ্রুত কার্যকর করা হোক।’’

রাজনের মা লুবনা আক্তার বলেন, রাজনকে হারানোর কষ্ট কোনো দিন শেষ হবে না। এত বছর হয়ে গেলেও তাকে ভুলতে পারেননি। বিচার হয়েছে, কিন্তু মামলাটি এখনো শেষ হয়নি। তিনি চান, যারা তার ছেলেকে মেরেছে তাদের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দ্রুত হোক। আর কোনো মায়ের সন্তান যেন এভাবে নির্যাতনের শিকার না হয়।

গ্রেপ্তার আসামিদের বিষয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় জেল সুপার মো. নাসির উদ্দিন প্রধান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। ঘটনাটা ২০১৭ সালের হওয়ায় তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে পারছেন না। তাদের এটার পুরো তথ্য পেতে কিছু সময় লাগবে। সূত্র রাইজিংবিডি

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৬
  • ১১:৫০
  • ৪:১১
  • ৫:৫৭
  • ৭:১০
  • ৫:৪০