শাহী ঈদগাহ মাঠে বাণিজ্য মেলা নিয়ে মুখোমুখি দুই পক্ষ

সিলেট নগরের ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহ মাঠে আগামী ১০ অক্টোবর থেকে মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলা আয়োজন নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে ব্যবসায়ী ও নারী উদ্যোক্তারা। একদিকে সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি মেলার আয়োজন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে নগরীতে ঘন ঘন স্থানীয় মেলা ও অস্থায়ী বাজার আয়োজন বন্ধের দাবিতে জেলা প্রশাসক ও সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। মেলা বন্ধের দাবির মধ্যে আয়োজকেরা উল্টো মেলা নির্বিঘ্নে করতে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা চেয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

আগামী ১০ অক্টোবর শাহী ঈদগাহ মাঠে শুরু হওয়ার কথা ‘সৃজনশীল পণ্য প্রদর্শনী, শিল্প-পণ্য ও বাণিজ্য মেলা ২০২৬’। মাসব্যাপী এ মেলার আয়োজন করছে সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। গত ১৪ সেপ্টেম্বর মাঠে মেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর আয়োজকেরা জানান, সিলেট অঞ্চলে গত তিন বছরে কোনো বাণিজ্য মেলা হয়নি। এ কারণে নারী উদ্যোক্তাসহ সারা দেশের সৃজনশীল পণ্য উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে এ মেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আয়োজক সংগঠনের সভাপতি লুবানা ইয়াছমিন শম্পা জানান, মেলা আয়োজনের জন্য জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। মেলা চলাকালে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার অনুমোদন রয়েছে বলে তিনি জানান। মাঠ সাজানো, আলোকসজ্জা, প্রবেশদ্বার ও অফিসসহ অবকাঠামোগত কাজের ক্ষেত্রেও অনুমোদন রয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে মেলা আয়োজনের বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একটি অংশ। গত ২১ সেপ্টেম্বর ‘ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট অ্যান্ড বিজনেসম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ ও বিভিন্ন মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জেলা প্রশাসক ও সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি দেন। তাদের দাবি, সিলেট নগরী ও আশপাশে ঘন ঘন স্থানীয় মেলা, পণ্য প্রদর্শনী ও অস্থায়ী বাজার আয়োজনের ফলে স্থায়ী ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।

ব্যবসায়ী নেতারা জানান, স্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, কর-ভ্যাট ও ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন ব্যয় বহন করে ব্যবসা পরিচালনা করে। অন্যদিকে অস্থায়ী স্টলে পণ্য বিক্রির সুযোগ থাকায় মেলার সময় স্থায়ী ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমে যায় বলে তাদের অভিযোগ। এতে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ, বিক্রি ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।

মেলা আয়োজনের কারণে যানজট, জনসমাগম, শব্দদূষণ ও সাধারণ মানুষের চলাচলে ভোগান্তির আশঙ্কার কথাও জানিয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, ঢাকা ছাড়া দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে বছরে একটি সুপরিকল্পিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আয়োজনের বিধান রয়েছে। এ ধরনের একটি মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে তাঁদের আপত্তি নেই। তবে এর বাইরে স্থানীয় বা অস্থায়ী মেলা আয়োজন বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ব্যবসায়ী নেতাদের দাবির মধ্যে রয়েছে; সিলেটে বছরে একটি নির্ধারিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা আয়োজন, এর বাইরে স্থানীয় মেলা ও অস্থায়ী বাণিজ্য মেলা বন্ধ রাখা, মেলা আয়োজনের জন্য অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন এবং নতুন মেলার অনুমোদনের আগে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতামত নেওয়ারও দাবি তাদের।

এদিকে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীরাও মাঠে মেলা না করার দাবি জানিয়ে আপত্তি তুলেছেন।

তারা জানান, সিলেট নগরে খেলার মাঠের সংখ্যা কম। সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ, এমসি কলেজ মাঠ ও শাহী ঈদগাহ মাঠএসব জায়গায় নিয়মিত খেলাধুলা করেন শিশু-কিশোর ও বিভিন্ন ক্লাবের সদস্যরা।

মেলা হলে প্রায় দুই মাস মাঠে খেলাধুলা বন্ধ থাকবে। মেলা শেষে মাঠের পরিবেশ ও অবকাঠামো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতেও সময় লাগতে পারে। তাঁদের মতে, খেলার মাঠের পরিবর্তে অন্য কোনো জায়গায় মেলার আয়োজন করা যেতে পারে।

অন্যদিকে মেলা বন্ধ না করে নির্ধারিত সময়ে আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে উইমেন চেম্বার। মেলা শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন করতে সংগঠনটি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে।

স্মারকলিপিতে মেলা শুরুর আগে থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের অনুরোধ জানানো হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণ বা আশপাশে কোনো বিশৃঙ্খলা কিংবা জোরপূর্বক প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টা হলে তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

উইমেন চেম্বারের সভাপতি লুবানা ইয়াছমিন শম্পা জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সিলেটের নারী ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্য বৃহত্তর ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরাই মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ও উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সংযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।

আয়োজকেরা আরও বলছেন, মেলা আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন নেওয়া হয়েছে এবং প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে। ব্যবসায়ীদের উদ্বেগকে সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করলেও কোনো ধরনের চাপ বা প্রতিবন্ধকতায় মেলা যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।

ফলে শাহী ঈদগাহ মাঠে মেলা আয়োজন নিয়ে এখন দুই পক্ষের অবস্থান স্পষ্ট। একদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ঘন ঘন মেলা বন্ধ ও স্থায়ী ব্যবসার পরিবেশ রক্ষার দাবি জানাচ্ছেন; অন্যদিকে উইমেন চেম্বার নির্ধারিত সময়ে মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা চাইছে। এখন মেলা আয়োজন নিয়ে প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন উভয় পক্ষ।

এদিকে খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের ব্যাপারে জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক, ক্রীড়া সংগঠক ও স্থানীয় বাসিন্দা বদরুজ্জামান সেলিম বলেন, খেলার মাঠে শিশুরা খেলবে। মাঠ বন্ধ করে মেলা হলে তারা খেলার জায়গা পাবে না। এই মাঠের পাশে হাসপাতাল ও স্কুল রয়েছে। বিশেষ করে শিশুরা এখানে খেলতে আসে। মেলা করতে হলে খেলার মাঠের বাইরে করা উচিত।

তবে জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, মেলা হবে। মেলার তো দরকার। এখনো পর্যন্ত বন্ধ হওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৬
  • ১১:৫০
  • ৪:১১
  • ৫:৫৭
  • ৭:১০
  • ৫:৪০