‘নিজাম উদ্দীন সালেহ
সিলেটের মানুষের দুটো ভাষা, একটা মুখের, আরেকটা বুকের। মুখেরটা বাংলা, বুকেরটা নাগরী।১৩০০ শতাব্দীতে হযরত শাহজালাল (রহ.) যখন শ্রীহট্টে এলেন, তখন থেকেই এই লিপির জন্ম। ফার্সি-আরবি হরফে সিলেটি মানুষ বাংলা উচ্চারণ লিখতে পারতো না। তাই সিলেটের মৌলভী-মুন্সিরা নিজের একটা লিপি তৈরি করেন। নাম দেন, সিলেটি নাগরী। অনেকের মতে, কালের বিবর্তনে এটা তৈরি হয়।এই লিপিতে কয়েক শতাব্দী ধরে লেখা হয়েছে তালপাতা, পুঁথি, প্রেমের চিঠি, ওয়াজের কিতাব, হালখাতা।
অনেকের দাদির সিন্দুকে এখনো পাওয়া যাবে ‘হালতুন্নবী’, “তালিব হুসন” পুঁথি — নাগরীতে লেখা। সুরমা নদীর মাঝি গান গাইতো নাগরীতে। সিলেটের প্রথম ছাপাখানা “ইসলামিয়া প্রেস” থেকে ছাপা হয়েছে নাগরী কিতাব।
আজ সিলেট নগরীর মীরাবাজারের আড়পাড়া গলি দিয়ে যেতে যেতে চোখ আটকে গেলো একটি বাড়ির নেইম প্লেইট বা নাম ফলকে নাগরীতে লেখা: ‘মায়ের কোল’।
সিলেটের মানুষ এখন প্রায়ই ইউটিউবে সার্চ দেয় “নাগরী লিপি”, এখনো মেলায় গিয়ে একটা নাগরীতে লেখা গেঞ্জি দেখলে দাঁড়িয়ে যায়। প্রবাসী ভাইয়ে লন্ডনের ব্রিকলেনে দোকানের নাম নাগরীতে লেখে, কারণ সে জানে, বাংলা সবাই বুঝে, কিন্তু নাগরী শুধু সিলেটি বুঝে। এটা আমাদের গোপন কোড, আমাদের রক্তের পরিচয়।বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, রাষ্ট্র ভাষা। এটাকে আমরা শ্রদ্ধা করি মাথায় তুলে রাখি। কিন্তু নাগরী আমাদের মায়ের ভাষার হাতের লেখা। জন্ম মাটির নিজস্ব লিপি, বুকের স্পন্দন। রাষ্ট্রভাষা দিয়ে চাকরি হয়, আর মায়ের হাতের লেখায় আবেগে চোখ অশ্রুসিক্ত হয়।
তাই অনেকেই এখন বাড়ির নাম ফলক ছোট করে হলেও নাগরীতে লেখেন। লিখেন দোকানের নাম সাইন বোর্ডে। নতুন প্রজন্ম জিগ্যেস করে,”এটা কী?”এর জবাব হচ্ছে— “এটা আমরা। এটা সিলেট।”নাগরী কোনো হরফ না, নাগরী হলো সিলেটের মানুষের আবেগ, শেষবারের মতো মা- জন্ম মাটিকে স্মরণ করার উপায়।
