আমেরিকার নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সর্ববৃহৎ সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন শেষ মুহূর্তে আটকে গেল ওসমান চৌধুরীর মামলায়। ২৫ অক্টোবর রবিবার এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এজন্য নির্বাচনের সব প্রস্তুতি ছিল চূড়ান্ত। নির্ধারিত পাঁচটি ভোটকেন্দ্রে ৩৫ হাজারের বেশি ভোটার আগামী র নেতৃত্ব নির্বাচন করতেন। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের দীর্ঘ প্রচার-প্রচারণা—অপেক্ষা ছিল কেবল ভোটগ্রহণের। কিন্তু ভোটের মাত্র দুই দিন আগে গত শুক্রবার আদালতের এক আদেশে স্থগিত হয়েছে নির্বাচন। এ নিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
সোসাইটির সাবেক কর্মকর্তা ওসমান চৌধুরীর সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান এবং তাকে সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় অবস্থিত কুইন্স কাউন্টি সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন আয়োজনের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।

আদালত শুধু ভোটগ্রহণই বন্ধ করেননি, ওসমান চৌধুরীর সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানসংক্রান্ত ২৮ আগস্টের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা থেকেও বাংলাদেশ সোসাইটিকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সংগঠনের মূল ভোটার তালিকা, সদস্যপদের আবেদনপত্র, চাঁদা পরিশোধের হিসাব ও নির্বাচনী ব্যালটসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণের আদেশ দিয়েছেন। আদালতের এ নির্দেশের পর শুক্রবার রাতে বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন কমিশন। এতে আদালতের আদেশ, মামলার অভিযোগ এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরবর্তী করণীয় নিয়ে কথা বলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু নাসেরসহ সংগঠনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ৫ নভেম্বর। মামলার নথি ও প্রকাশিত আবেদনের বিবরণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক কর্মকর্তা ওসমান এ চৌধুরী ২০২৬ সালের নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী ছিলেন। এ উদ্দেশে তিনি সাধারণ সদস্যপদের জন্য আবেদন করেন।

বাদীর দাবি, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন ও ২০ ডলার ফি জমা দেওয়ার পরও গত ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যনির্বাহী কমিটি তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর পাঠানো প্রত্যাখ্যানপত্রে বাংলাদেশ সোসাইটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চলমান মামলা এবং সংগঠনের গঠনতন্ত্রের নবম অনুচ্ছেদের ৬ নম্বর ধারাকে সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ওসমান চৌধুরীর অভিযোগ, এর আগে সংগঠনের বিভিন্ন নির্বাচনী অনিয়ম ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার কারণেই তার সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ওসমান চৌধুরীর দাবি, এই সিদ্ধান্ত ছিল প্রতিশোধমূলক এবং এর মাধ্যমে তাকে ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
বাদীপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান স্থায়ী নয় বলে চিঠিতে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নষ্ট হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়েও কোনো চূড়ান্ত রায় আসেনি। মামলাটি কেবল সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাদীপক্ষ বাংলাদেশ সোসাইটির গঠনতন্ত্র ও উপবিধির নবম অনুচ্ছেদের ৬ নম্বর ধারার বৈধতাও চ্যালেঞ্জ করেছে।

বাদীপক্ষের যুক্তি, সংশ্লিষ্ট বিধানটি নিউইয়র্কের প্রচলিত আইন ও জননীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সদস্যদের আইনি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার সীমিত করে। নিউইয়র্কের সিভিল প্র্যাকটিস ল অ্যান্ড রুলসের আর্টিকেল ৭৮ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিধানের অধীনে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
বাদী আদালতের কাছে ২৮ আগস্টের সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত বাতিল, বিতর্কিত গঠনতান্ত্রিক বিধানকে অকার্যকর ঘোষণা, তাকে বৈধ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বা পুনর্বহাল এবং সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য ঘোষণার আবেদন জানিয়েছেন। পাশাপাশি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন বন্ধ রাখা, গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ এবং মামলার খরচ ও আইনজীবীর ফি প্রদানের নির্দেশও চাওয়া হয়েছে।

জানা যায়, বর্তমান বিরোধের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ সোসাইটির আগের নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ।
মামলার আবেদনে ওসমান চৌধুরী অতীতের নির্বাচনী কর্মকাণ্ড নিয়েও একাধিক অভিযোগ তুলেছেন। তার অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, অস্বাভাবিক হারে প্রার্থীদের মনোনয়ন ফি নির্ধারণ, যথাযথ আবেদনপত্র ছাড়া সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং অন্যের সদস্যপদের চাঁদা পরিশোধের মাধ্যমে ভোটার তালিকা প্রভাবিত করার চেষ্টা। ২০১৮ সালের নির্বাচনসংক্রান্ত অভিযোগে এক রাতে প্রায় ২৭ হাজার কথিত ভুয়া সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ও বাদীপক্ষ উত্থাপন করেছে। একই সঙ্গে উচ্চ মনোনয়ন ফি সাধারণ সদস্যদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ওসমান চৌধুরীর দাবি, তিনি এর আগেও সংগঠনের অভ্যন্তরে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন, কিন্তু যথাযথ প্রতিকার পাননি। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালেও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।
এবারের মামলার প্রেক্ষিতে গত
২৩ অক্টোবর শুক্রবার ‘অর্ডার টু শো কজ উইথ টেম্পোরারি রেস্ট্রেইনিং অর্ডার’ কুইন্স কাউন্টি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক চেরি এ বাগস জরুরি বিচারক হিসেবে আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। মামলার বিবাদীদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকরপোরেটেড, সভাপতি এস এম এ রহমান ওরফে সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, কোষাধ্যক্ষ মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু নাসের।

আদেশে সোসাইটির কর্মকর্তা, নির্বাচন কমিশনার, ট্রাস্টি, প্রতিনিধি এবং তাঁদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও সাময়িক নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। আদালত আগামী ২৬ অক্টোবরের মধ্যে বিবাদীদের কাছে আদেশ ও সংশ্লিষ্ট মামলার নথি নির্ধারিত পদ্ধতিতে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে আপাতত নির্বাচন আয়োজন বন্ধ হলেও এটিকে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বর্তমান আদেশে ওসমান চৌধুরীর সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়নি। তাঁকে সভাপতি প্রার্থী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়নি। একইভাবে সোসাইটির গঠনতন্ত্রের বিতর্কিত ধারাটি অবৈধ ঘোষণা করেননি আদালত।

বরং প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞার আবেদন নিয়ে পরবর্তী শুনানি ও সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বর সকাল ১০টায় কুইন্স সুপ্রিম কোর্টের পার্ট ২৩, কক্ষ ১৪০-এ পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত রয়েছে। সেখানে মামলার বিবাদীদের আদালতে তাঁদের অবস্থান ও যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। এদিকে আদালতের নির্দেশের পর শুক্রবার রাতেই বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু নাসের আদালতের স্থগিতাদেশ, বাদীপক্ষের অভিযোগ এবং নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া আইনি পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী। সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনের অন্য সদস্যদের পাশাপাশি ট্রাস্টি বোর্ড ও কার্যনির্বাহী পরিষদের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে আদালতের এমন আদেশে দীর্ঘ প্রস্তুতির পর কীভাবে পরবর্তী নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালিত হবে, আদালতের নির্দেশের আলোকে কী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব এবং নির্বাচন পুনরায় আয়োজনের সম্ভাব্য প্রক্রিয়া কী হতে পারে—এসব বিষয় সামনে আসে।

তবে আদালতের নতুন কোনো নির্দেশ ছাড়া পূর্বনির্ধারিত ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সোসাইটির এবারের নির্বাচনে ৩৫ হাজার ২১৫ জন নিবন্ধিত ভোটারের অংশগ্রহণের কথা ছিল। পাঁচটি ভোটকেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিল দুটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল—বর্তমান সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বাধীন ‘সেলিম-আলী’ প্যানেল এবং সাবেক সভাপতি আজমল হোসেন কুনু ও ফিরোজ আহমেদের নেতৃত্বাধীন ‘কুনু-ফিরোজ’ প্যানেল।

দুটি প্যানেলের ৪২ জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ৪৩ জন প্রার্থী কার্যনির্বাহী পরিষদের ২১টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। নির্বাচিত কমিটির দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ২০২৭ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে। ভোটকে সামনে রেখে প্রার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় সভা, গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তের আদালতের নির্দেশে থমকে গেছে নির্বাচনী সব আয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *