শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা পাঁচ দিনের অবকাশে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সিলেটের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র। সবুজ চা বাগান, টিলার মনোরম দৃশ্য এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন পর্যটকেরা। তবে পর্যটকদের এই বাড়তি উপস্থিতির মধ্যে অতিরিক্ত সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া আদায় ও হোটেলে কক্ষসংকটের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেকে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেটের লাক্কাতুরা, মালনীছড়া, আহমদ টি ও তারাপুর চা বাগানে পর্যটকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। চা বাগানের সবুজের মাঝে ছবি তোলা, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে ব্যস্ত ছিলেন বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীরা।
বিশেষ করে লাক্কাতুরা চা বাগানসংলগ্ন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম এলাকা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষজনের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও ছুটির আনন্দ উপভোগ করছেন।
চা বাগানের সৌন্দর্যে মুগ্ধ পর্যটকেরা
কুষ্টিয়া থেকে সিলেটে বেড়াতে আসা পিপি রানী নাথ জানান, দুর্গাপূজার সময় আসতে না পারলেও পূজা শেষে তিনি সিলেটে ঘুরতে এসেছেন। এখানকার পাহাড় ও চা বাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁর কাছে দারুণ লেগেছে। পাশাপাশি সিলেটের খাবার এবং স্থানীয় মানুষের আন্তরিক ব্যবহারেও মুগ্ধ হয়েছেন তিনি।
নরসিংদী থেকে বন্ধুদের নিয়ে সিলেটে বেড়াতে এসেছেন সাইদুল। তিনি জানান, শাহজালালের মাজারে তিনি প্রায়ই পরিবার নিয়ে আসেন। সিলেটের মানুষের আতিথেয়তা ও প্রকৃতির স্নিগ্ধতা তাঁকে বারবার আকৃষ্ট করে। সুযোগ পেলেই আবারও সিলেটে আসার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
পর্যটকদের আগমনে নগরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও ব্যস্ততা বেড়েছে। বাড়তি ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের কারণে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব পড়লেও যাতায়াত ও আবাসন নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া নিয়ে অভিযোগ
পর্যটকদের অভিযোগ, নগরের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কিছু সিএনজি অটোরিকশাচালক স্বাভাবিক ভাড়ার তুলনায় দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত ভাড়া চাইছেন। ফলে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা অনেক পর্যটককে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতির সভাপতি জাকারিয়া। তাঁর বক্তব্য, নগরের সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া ঠিক রয়েছে। তবে অন্য জেলা বা উপজেলা থেকে চালকেরা বেশি ভাড়ায় সিএনজি নিয়ে এলে সে ক্ষেত্রে তাঁদের কিছু করার নেই।
হোটেলে কক্ষসংকট, বিপাকে পরিবারগুলো
পর্যটকদের চাপ বাড়ায় সিলেটের আবাসন খাতেও সংকট দেখা দিয়েছে। আগে থেকে হোটেলের কক্ষ বুকিং না দিয়ে আসা অনেক পরিবারকে থাকার জায়গা খুঁজতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ছুটির সময়ে পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হোটেল ও আবাসিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও যাতায়াতের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে পরিবহন ও হোটেল ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় পুলিশের নজরদারি
এদিকে পর্যটকবাহী বাসের ভিড়ে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা-সংলগ্ন সড়কে বাসের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)।
এসএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. আফজাল হোসেন জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। কোনো পর্যটক পরিবহনসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলা বা হয়রানির শিকার হলে স্থানীয় থানা অথবা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ অভিযোগ জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। অভিযোগ পেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকদের এই আগমন স্থানীয় পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। তবে অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া ও আবাসনসংকট নিরসন করা গেলে পর্যটকদের ভ্রমণ আরও স্বস্তিদায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
