আমাদের শরীর নামক এই লিজ নেওয়া বাড়িটিও পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত বেশ জাঁকজমকেই টিকে থাকে।
ত্রিশ পার হতেই কোথাও কোথাও ইট খসতে শুরু করে, চল্লিশে গিয়ে ছাদে চিড় ধরে, আর পঞ্চাশের কাছাকাছি পৌঁছালে বাড়িওয়ালা মহাকাল যেন নোটিশ ধরিয়ে বলেন, “বাপু, এবার মেরামতির খরচ নিজেই সামলাও!”
আমরা অবশ্য সহজে হার মানার পাত্র নই। চুলে কলপ লাগাই, পেটে বেল্ট আঁটি, পুরোনো প্যান্টটাকে নতুন বলে চালানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আয়নার ভেতরের লোকটি সব জানে।
সে মুচকি হেসে বলে, “কাকে ফাঁকি দিচ্ছ ভাই?”
শারীরিক বিপদের কথাই ধরা যাক। একসময় রাত দুটোয় চারটে মোগলাই পরোটা, কাটলেট আর মাংস খেয়ে পরদিন সকালে মাঠে ক্রিকেট খেলতে নামলেও শরীরের কোনও আপত্তি ছিল না। এখন সন্ধ্যার পর একটা সিঙ্গারা খাওয়ার আগে শরীরের সঙ্গে বৈঠক করতে হয়।
“একটা সিঙ্গারা খাব?”
পেট বলে,“ভেবে দেখ।”
“চপ?”
পেট চুপ।
“তা হলে মুড়ি?”
পেট বলে,“এই তো বুদ্ধির কথা!”
সকালে ঘুম থেকে ওঠাটাও এখন আর ঘুম ভাঙা নয়, পুরনো ডিজেল ইঞ্জিন চালু করার মতো একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া। প্রথমে চোখ খোলে, তারপর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। পিঠ, হাঁটু, কোমর এই তিনজনের মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা চলছে, কে আগে অভিযোগ জানাবে। বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে কোমর থেকে ‘কটাত’ শব্দ বেরোয়। মনে হয়, শরীরের ভেতরে কাঠমিস্ত্রি কাজ করছে।
ডাক্তারবাবুকে বললে তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে বলেন, “এ তো বয়সের ধর্ম!”
ডাক্তারের এই একটি বাক্য পৃথিবীর সমস্ত বয়সজনিত সমস্যার সরকারি শংসাপত্র। হাঁটু ব্যথা? বয়সের ধর্ম। কোমর ব্যথা? বয়সের ধর্ম। ঘাড় শক্ত? বয়সের ধর্ম।
মনে হয়, বয়স যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আসামি, সব অপরাধ তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই হল! তবে শরীরের এই ভাঙন যতটা নয়, তার চেয়েও বড় বিপদ হল স্মৃতিশক্তির গা-ঢাকা দেওয়া। ত্রিশ বছর আগে দেখা সিনেমার গল্প, নায়ক-নায়িকার পোশাক, কোন গানে কে কীভাবে
নেচেছিল, সব মনে আছে।
কিন্তু দশ সেকেন্ড আগে হাতে থাকা চশমাটা কোথায় রেখেছি, তা মনে নেই। চশমা খুঁজতে খুঁজতে ঘর তোলপাড়। শেষে বাড়ির কেউ বলে,“চশমাটা কপালে আছে।”
তখন চশমার চেয়ে নিজের স্মৃতিশক্তির ওপরই বেশি রাগ হয়। বাজারে গিয়ে ফর্দ ভুলে যাওয়া তো নিত্য ব্যাপার। আরও বিপজ্জনক হল, রাস্তায় বহুদিনের পরিচিত কাউকে দেখে তার নাম মনে না পড়া।
“আরে! আপনি! ~কতদিন পরে দেখা!
”সামনের মানুষটি খুশি।
“আমাকে চিনতে পারছেন তো?”
“আপনাকে চিনব না?”
চিনছি বটে, কিন্তু নামটা কোথায় গেল, এই প্রশ্নের উত্তর মস্তিষ্ক তখন দিতে অস্বীকার করে। বয়স বাড়ার সামাজিক বিপদও কম নয়। প্রথম পাকা চুলটি যখন আয়নায় দেখা যায়, তখন মানুষ সেটিকে অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে। তারপর ভাবে, “একটা মাত্র তো!”
কয়েক মাস পরে সেই ‘একটা’ তার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মিছিল করে আসে। তারপর একদিন বাসে বা মেট্রোয় কোনও তরুণ উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“কাকু, বসুন।”
এই ‘কাকু’ শব্দটি যে কী গভীর আঘাত করতে পারে, তা কেবল প্রথমবার শুনেছেন এমন ব্যক্তিই জানেন। বসার আগে মনে হয়, আসনে বসব, না কি নিজের যৌবনের স্মৃতির ওপর বসব! আর প্রযুক্তি? সেখানে বয়সের কাছে পরাজয় প্রায় নিশ্চিত। বিশ বছরের ছেলে দুটো আঙুল ফোনে চালিয়ে এমন কাজ করে ফেলে, যেটা করতে আপনি আধঘণ্টা ধরে চেষ্টা করছেন।
“এইটা কী করে হল?”
“এই তো, এখানে চাপুন।”
“কোথায়?”
“এই যে!”
দুই সেকেন্ডে সমস্যা সমাধান।
তখন মনে হয়, মানুষটি মানুষ নয়, স্মার্টফোনের সঙ্গে জন্মানো কোনও উন্নত প্রজাতি। তবু বয়সের এই বিপুল ষড়যন্ত্রের মধ্যেও একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে।
বয়স আমাদের শরীর
থেকে কিছু শক্তি কেড়ে নেয়, কিন্তু বিনিময়ে দেয় অভিজ্ঞতা।
আগে যে কথায় রাগ হত, এখন সেখানে হাসি পায়। আগে প্রতিটি তর্কে জিততে চাইতাম, এখন বুঝি, সব তর্কে জেতার প্রয়োজন নেই।
আগে পৃথিবীকে বদলাতে চাইতাম, এখন নিজের চায়ের কাপটা ঠিকমতো পেলেই বেশ সন্তুষ্টি। বয়স শেখায়, জীবনের বড় সুখগুলো অনেক সময় খুব ছোট, এক কাপ গরম চা, পুরোনো বন্ধুর ফোন, বিকেলের হাওয়া, প্রিয় মানুষের সঙ্গে গল্প, কিংবা বহুদিন পর শোনা কোনও পুরোনো গান। হাঁটু মচমচ করুক, চশমা কপালেই থাকুক, সিঁড়ি দেখে বুক ধড়ফড় করুক, বিরিয়ানির বদলে পেঁপে সিদ্ধ জুটুক, তাতে কী?
মহাকাল যখন বয়সের নোটিশ ধরিয়েই দিয়েছে, তখন মামলা লড়ে লাভ কী! বরং নোটিশটা হাতে নিয়ে হেসে বলাই ভালো।
“বাড়িওয়ালা মশাই, মেরামতির খরচ যতই নিন, একটা অনুরোধ, হাসিটা যেন অক্ষত থাকে!” কারণ বয়স বাড়ার সবচেয়ে বড় বিপদ বোধহয় বয়স বাড়া নয়, বরং বয়স বেড়েছে বলে হাসতে ভুলে যাওয়া। (সংগৃহীত)
