সিলেটে ৩৭২৩ কুকুর পেল
জলাতঙ্কের প্রতিষেধক

বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রবে সিলেট নগরীর মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা একসময় ছিল আতঙ্ক ও উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে কাকডাকা ভোরে কিংবা রাতে রাস্তাঘাটে যাতায়াতকারী পথচারী এবং বিদ্যালয়গামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রায়ই পড়ত চরম ভোগান্তিতে। সমস্যা সমাধানে নগরবাসীর অনেকেই সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে সরাসরি প্রতিকার চেয়ে আবেদন জানান।

তবে বিদ্যমান ‘প্রাণী কল্যাণ আইন’ অনুযায়ী কুকুর নিধন বা কোনো প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। রয়েছে উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞাও। তাই কেবল জনদুর্ভোগ নয়, প্রাণিসম্পদের সুরক্ষা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই একটি সময়োপযোগী বিকল্প বেছে নেয় নগর কর্তৃপক্ষ। কুকুর নিধনের পরিবর্তে নগরবাসীকে জলাতঙ্কের হাত থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখতে মাস ডগ ভ্যাকসিনেশন (MDV) কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যাপক টিকাদান অভিযান সম্পন্ন করেছে সিসিক।

সিসিক ও সিলেট জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই বিস্তৃত কার্যক্রম ১২ অক্টোবর উদ্বোধন করেন সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। উদ্বোধনের পর থেকে নগরীর ৪২টি ওয়ার্ডজুড়ে ধাপে ধাপে পরিচালিত এ অভিযানে ৩ হাজার ৭২৩টি বেওয়ারিশ ও মালিকানাধীন কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকাদান করা হয়। টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার।

বিশেষ চিহ্নিতকরণ ও সচেতনতা: টিকাদান কার্যক্রম শেষে প্রতিটি কুকুরকে গোলাপি রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিসিক সূত্র জানায়, এর মূল উদ্দেশ্য হলো—কোনো এলাকা বা কুকুর যাতে টিকাদানের আওতার বাইরে থেকে না যায়, তা সহজে শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য কার্যক্রমেও এ পরিসংখ্যান কাজে লাগানো।

এ বিষয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “নগরীর যেখানে-সেখানে উচ্ছিষ্ট বা পরিত্যক্ত খাবার ফেলা রাখা হয়, বিশেষ করে বর্জ্য অপসারণের ঠিক আগের মুহূর্তে খাবারের খোঁজে সেখানে বেওয়ারিশ কুকুরের আনাগোনা বেশি দেখা যায়। বাসাবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশেও তাদের বিচরণ লক্ষ করা যায়। এসব বিষয় মাথায় রেখেই জনস্বার্থ ও নাগরিক নিরাপত্তার সুবিধার্থে আমরা গণ-টিকাদানের এই বিশেষ উদ্যোগ নিই। কুকুর নিধন কোনো সমাধান নয়; বরং টিকাদানের মাধ্যমে সংক্রমণ দূর করে নগরবাসীকে নিরাপদ রাখাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”

তিনি আরও যোগ করেন, “কোনো টিকাপ্রাপ্ত কুকুর যদি কাউকে কামড়ায় বা আঁচড় দেয়, তাহলেও আতঙ্কিত না হয়ে বাড়তি সতর্কতা হিসেবে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সিটি কর্পোরেশন সর্বদা তৎপর রয়েছে এবং এতে নগরবাসীর সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত কাম্য।”
সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “জলাতঙ্কসহ বিভিন্ন রোগ থেকে নগরবাসীকে সুরক্ষা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। সেই দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় সিলেট নগরবাসীর জলাতঙ্কের ঝুঁকি বহুলাংশে হ্রাস পাবে।”

প্রকৃতি ও প্রাণীর ভারসাম্য বজায় রেখে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ সিলেট নগরীতে ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *