জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ছিলেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও লেখক। ১৯০৬ সালের ২৫ অক্টোবর সুনামগঞ্জ জেলার তেঘরিয়া গ্রামে তার নানা মরমি কবি হাছন রাজার বাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ ছিলেন দুহালিয়ার জমিদার। তার মাতা রওশন হুসেইন বানু ছিলেন হাসন রাজার জ্যেষ্ঠ কন্যা। 

মোহাম্মদ আজরফ ১৯৩০ সালে সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ থেকে ডিস্টিংকশনসহ বিএ পাশ করেন এবং ১৯৩২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৮ সালে সুনামগঞ্জ কলেজের যুক্তিবিদ্যার প্রভাষক পদে যোগ দিয়ে মোহাম্মদ আজরফ শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন এবং ১৯৫৪ সালে এ কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে তিনি বিভিন্ন কলেজে অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেন। 

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগে যোগদান করেন এবং আসাম প্রাদেশিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সমর্থক ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি আসামে বহিরাগত মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ জানান এবং ১৪৪ ধারা অমান্য করেন। এ কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তিনি শিলচরে দশ মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন।

মোহাম্মদ আজরফ ছিলেন ভাষা আন্দোলনের একজন দৃঢ় সমর্থক। ১৯৪৮ সালে ‘নও বেলাল’ পত্রিকার সম্পাদক থাকাকালে তিনি ওই পত্রিকায় ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে লেখা শুরু করেন। এ কারণে তাকে ১৯৫৪ সালে সুনামগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। তিনি ১৯৪৯ সালে তমদ্দুন মজলিশের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আজীবন ওই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ দর্শন সমিতির সভাপতি ছিলেন। একজন বিশিষ্ট দার্শনিক হিসাবে তিনি বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা-প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

তার প্রায় ৬০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ অপ্রকাশিত রয়েছে। স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকসহ আরও বেশকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৩ সালের ৪ নভেম্বর তাকে জাতীয় অধ্যাপক পদ প্রদান করে। ১৯৯৯ সালের ১ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *