যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। মিশিগানে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন। মঙ্গলবার রাতের এই জয় শুধু মিশিগানের নয়, পুরো মার্কিন রাজনীতির জন্য একটি মাইলফলক।

ফলাফল অনুযায়ী, আল-সাইয়েদ পেয়েছেন ৫২ শতাংশ ভোট, প্রায় ২২ লাখ ৭ হাজার। রজার্স পেয়েছেন ৪৬ শতাংশ, প্রায় ১৯ লাখ ৫৫ হাজার। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ভোর ২টা ২৭ মিনিটে এই আসনটিতে আল-সাইয়েদকে বিজয়ী ঘোষণা করে। এই আসনটি খালি হয়েছিল ডেমোক্র্যাট গ্যারি পিটার্সের অবসরের কারণে। এটি ছিল ডেমোক্র্যাটদের জন্য ধরে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর একটি।

আল-সাইয়েদের বিজয়ী ভাষণ ছিল আবেগঘন। ডেট্রয়েটে সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “মিশিগান, আমরা পেরেছি। আপনাদের সিনেটর-ইলেক্ট হিসেবে দাঁড়াতে পেরে আমি গর্বিত ও সম্মানিত। আজ রাতে আমরা ইনশাআল্লাহকে আলহামদুলিল্লাহতে পরিণত করতে পারি।” এই বাক্যটি মুহূর্তে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

কে এই আবদুল আল-সাইয়েদ? বয়স ৪২। মিশিগানের রচেস্টার হিলসে জন্ম। বাবা মিসর থেকে আসা অভিবাসী। পেশায় চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। কলম্বিয়া ও অক্সফোর্ডে পড়াশোনা। ৩০ বছর বয়সে ডেট্রয়েটের ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য পরিচালক হয়েছিলেন। করোনা মহামারির সময় তার কাজ প্রশংসিত হয়। ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে প্রার্থী হয়েছিলেন, কিন্তু জেতেননি। এবার তিনি ফিরে এসেছেন প্রগতিশীল এজেন্ডা নিয়ে, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানো, এবং শ্রমজীবী পরিবারের খরচ কমানো।


এই জয়ের পথ সহজ ছিল না। প্রথমে ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে তাকে লড়তে হয়েছে দলের প্রতিষ্ঠিত প্রার্থী হ্যালি স্টিভেন্সের বিরুদ্ধে। সেখানে প্রভাবশালী লবি সংস্থা এআইপিএসি তার বিরুদ্ধে তিন কোটি ডলারের বেশি খরচ করেছে বলে আল-জাজিরা জানিয়েছে। তারপর সাধারণ নির্বাচনে রিপাবলিকানরা তার ধর্মকে আক্রমণের হাতিয়ার বানায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে “জিহাদি” বলেছেন এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যোগসাজশের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছেন। এল-সায়েদ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, এর কোনো প্রমাণ নেই।


প্রতিপক্ষ মাইক রজার্স, ৬৩ বছর বয়সী সাবেক কংগ্রেসম্যান ও এফবিআই এজেন্ট, ২০২৪ সালেও সিনেটে হেরেছিলেন এলিসা স্লটকিনের কাছে মাত্র শূন্য দশমিক তিন শতাংশ ভোটে। এবার ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন নিয়েও তিনি হেরে গেলেন। শেষ মুহূর্তে হ্যালি স্টিভেন্সও রজার্সকে সমর্থন দেন, কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি।
আল-সাইয়েদের জয় ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল অংশের জন্য বড় জয়। এটি প্রমাণ করে, মিশিগানের মতো পার্পল স্টেটে, যেখানে আরব-আমেরিকান ভোটার অনেক, সেখানে মুসলিম পরিচয় নিয়ে লুকিয়ে না থেকে খোলাখুলি লড়াই করেও জেতা যায়। আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউটের নির্বাহী মায়া বেরি বলেছেন, “রিপাবলিকানরা মুসলিম-বিদ্বেষকে কৌশল বানিয়েছিল, মিশিগানের ভোটাররা সেই ঘৃণা প্রত্যাখ্যান করেছে।”


আগামী ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেসে শপথ নেবেন আল-সাইয়েদ। তিনি হবেন সিনেটের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম, এবং ১৯৬৯ সালের পর প্রথম চিকিৎসক ডেমোক্র্যাট সিনেটর। তার জয়ের মধ্য দিয়ে মিশিগানে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট ও হাউজে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরল, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের শেষ দুই বছরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *