নিজাম উদ্দীন সালেহ 

দুই বছর আগে বিপুল উল্লাসে হোয়াইট হাউসে ফিরেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছিলেন, আমেরিকাকে আবার মহান করবেন। দুই বছর পর, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল বলছে, আমেরিকা ক্লান্ত, বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ। ভোটাররা তার ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তার জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে।

গতকালের নির্বাচন ছিল ট্রাম্পের জন্য গণভোট। তিনি নিজেই তাই বানিয়েছিলেন। প্রতিটি সভায় বলেছেন, “আমার নামে ভোট দিন।” ভোটাররা দিয়েছে, তবে তার বিপক্ষে।

রয়টার্স ও এসএসআরএস-এর যৌথ এক্সিট পোল বলছে, ৫২ শতাংশ ভোটার মনে করে দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে যারা ট্রাম্পকে জিতিয়েছিল, সেই শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী, লাতিনো ও তরুণ ভোটাররাই এবার সবচেয়ে বেশি দূরে সরে গেছে। লাতিনোদের ৬২ শতাংশ এবং ৩০ বছরের কম বয়সী ভোটারদের ৭২ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছে। কানসাসের মতো রাজ্যে, যেখানে ১৯৩২ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর জেতেনি, সেখানে এবার রিপাবলিকানরা হেরেছে। এটি কোনো সাধারণ পরাজয় নয়, এটি প্রত্যাখ্যান।

কেন এই ধস? তিনটি কারণ পরিষ্কার। প্রথমত অর্থনীতি। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দাম কমাবেন। বাস্তবে হয়েছে উল্টো। তার শুল্কনীতি ও ইরান যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি এখন ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, যা তার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ছিল ৩ শতাংশের নিচে। ডিম, পেট্রল, ভাড়া সবকিছুর দাম বেড়েছে। সাধারণ পরিবার প্রতি মাসে গড়ে ৪০০ ডলার বেশি খরচ করছে। ভোটাররা পকেট দিয়ে টের পাচ্ছে, উন্নয়ন হয়নি, হয়েছে মুদ্রাস্ফীতি।

এছাড়া যুদ্ধ। ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি যুদ্ধ বন্ধ করবেন। কিন্তু তার আমলে আমেরিকা ইরানের সঙ্গে একটি অপ্রিয় যুদ্ধে জড়িয়েছে। এই যুদ্ধের কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য নেই, কোনো প্রস্থান কৌশল নেই। তরুণ ভোটাররা, বিশেষ করে যারা কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছে, তারা এই যুদ্ধকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এক্সিট পোলে ৫৮ শতাংশ ভোটার বলেছে, তারা ইরান যুদ্ধের বিরোধী।

সর্বোপরি, ক্ষমতার অপব্যবহার। গত দুই বছরে ট্রাম্প প্রশাসন বিচার বিভাগ, এফবিআই এবং কংগ্রেসকে নিজের হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করেছে। বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা, সংবাদমাধ্যমকে “শত্রু” বলা, এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ ছড়ানো, এগুলো আমেরিকার মধ্যপন্থী ভোটার পছন্দ করেনি। তারা স্থিতিশীলতা চায়, নাটক নয়।

ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, তিনি নিজের ভিত্তির বাইরে যেতে পারেননি। তিনি মিশিগানে আবদুল আল-সাইয়েদকে “জিহাদি” বলেছেন। টেক্সাসে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছেন। সাউথ ক্যারোলাইনায় তার হাতে বাছাই করা প্রার্থী হেরেছে। এই ব্যক্তিগত আক্রমণের রাজনীতি এখন বুমেরাং হয়েছে।

ফক্স নিউজে তিনি বলেছেন, “আমি ব্যালটে থাকলে ফল ভিন্ন হতো।” এটি আত্মপ্রবঞ্চনা। তিনি ব্যালটে না থেকেও ব্যালটে ছিলেন। তার নাম, তার ছবি, তার ভাষণ — সব জায়গায় ছিল। ভোটাররা তাকেই প্রত্যাখ্যান করেছে।

এখন তার হাতে আর কী আছে? সংবিধান অনুযায়ী তিনি তৃতীয় মেয়াদে লড়তে পারবেন না। দলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ শিথিল হচ্ছে। জানুয়ারি থেকে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস তার পরিবার, ব্যবসা ও প্রশাসনের ওপর তদন্ত শুরু করবে। বিদেশেও তার গ্রহণযোগ্যতা কমেছে।

ট্রাম্প ভেবেছিলেন, তিনি দলকে বদলে দিয়েছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, ভোটাররা দলকে তার কাছ থেকে ফিরিয়ে নিচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রমাণ করেছে, আমেরিকা এখনো প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে, ঘৃণার চেয়ে স্থিতিশীলতাকে বেছে নেয়। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার গ্রাফ নিম্নমুখী, এবং এই পতন তার নিজের তৈরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *