নিজাম উদ্দীন সালেহ
ইসরাইলের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন দেশটির রাজনীতিতে কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে ব্যর্থ হয়েছে, উল্টো এক চরম অস্থিতিশীল ও পঙ্গুত্বপূর্ণ অচলাবস্থার দিকে রাষ্ট্রটিকে ঠেলে দিয়েছে। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের ‘ম্যাজিক ফিগার’ স্পর্শ করতে পারেনি কোনো পক্ষই। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থী ও ডানপন্থী জোট ৫৩ আসনেই থমকে গেছে, আর তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮ আসন। এই সংখ্যাতাত্ত্বিক জটিলতা ও ক্ষমতার লিপ্সা ইসরাইলকে এমন এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড় করিয়েছে, যা কেবল একটি রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং দেশটির শাসনব্যবস্থার দেউলিয়াত্বের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
এই অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এটি কোনো আদর্শিক ভিন্নতার কারণে সৃষ্টি হয়নি, বরং তৈরি হয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক অহমিকা এবং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে। বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্নীতি ও অপরাধের মামলার বিচার এড়াতে নেতানিয়াহু যেভাবে রাষ্ট্রকে নিজের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন, তা এক চরম ধিক্কারজনক নজির সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ভয়ে তিনি উগ্র-ডানপন্থী এবং কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সাথে আপস করতেও দ্বিধা করেননি। অন্যদিকে, আইজেনকটের বিরোধী জোটের নীতিতেও দূরদর্শিতার চেয়ে কেবল ‘নেতানিয়াহু হটাও’ এজেন্ডাই প্রধান ছিল। ক্ষমতার এই নোংরা খেলায় রাজনৈতিক দলগুলো ভুলে গেছে যে, একটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হলো তার জনগণ, কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা গোষ্ঠী নয়।
নির্বাচনের এই অচলাবস্থায় এক নতুন অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে আরব দলগুলো, যারা এবার রেকর্ড ১৯টি আসন লাভ করেছে। অথচ ঐতিহাসিক ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ইহুদিবাদী দলগুলো সরকার গঠনে তাদের সরাসরি অংশীদার করতে চরমভাবে দ্বিধাগ্রস্ত। আইজেনকটের জোট ৬৭টি সমর্থনের সুপারিশ পেয়ে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ কর্তৃক সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করলেও, আরব দলগুলোর সাথে আনুষ্ঠানিক জোট গড়ার ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের ভেতরের ডানপন্থীরাই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু এই বিপুল আরব ভোটার উপস্থিতিকে ‘নির্বাচন হাইজ্যাক’ বলে চরম উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, ইসরাইলি নেতৃত্ব নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে দেশের একটি বড় অংশের নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে অবজ্ঞা করতেও পিছপা হয় না।
যখন গাজা ও আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ইরানের সাথে চরম সামরিক উত্তেজনার মুখোমুখি ইসরাইল, তখন একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকারের প্রয়োজনীয়তা ছিল অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই ক্রান্তিলগ্নেও দেশটির নেতারা ক্ষমতার ভাগাভাগি ও জোটের দরকষাকষিতে ব্যস্ত। এই চরম রাজনৈতিক পক্ষাঘাতের কারণে ইসরাইল হয়তো আরও একটি নতুন নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা হবে গত কয়েক বছরের মধ্যে তাদের সপ্তম সাধারণ নির্বাচন। বারবার নির্বাচন মানেই শত শত কোটি ডলারের অপচয় এবং জনগণের ট্যাক্সের পয়সা নিয়ে তামাশা।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যখন বারবার তার জনগণকে একটি কার্যকর সরকার উপহার দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। ইসরাইলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আজ দেশটিকে এমন এক গোলকধাঁধায় বন্দি করেছে, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ নেই। ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ক্ষমতার অন্ধ মোহ কীভাবে একটি আধুনিক রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণভাবে ভঙ্গুর এবং নীতিগতভাবে পঙ্গু করে দিতে পারে, ইসরাইলের এই অবিরাম নির্বাচনী অচলাবস্থা তারই এক জ্বলন্ত ও কড়া সমালোচনাযোগ্য উদাহরণ।
