শতাবব্দি প্রাচীন সিলেটের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার। ছবি : সংগৃহীত

সিলেটের শতাব্দী প্রাচীন পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের বিশাল স্থানটিকে পার্ক ও উন্মুক্ত বিনোদন কেন্দ্রে রূপান্তরের বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি নগরীর প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজারের প্রাচীন ও জরাজীর্ণ ‘হাসান মার্কেট’ ভেঙে সেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংসহ আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর পৃথক দুটি ঘোষণার পর নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানটিকে পার্ক বানিয়ে “সিলেট নগরের ফুসফুস” হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, নগরবাসীর স্বাস্থ্যরক্ষা, হাঁটাচলা ও বিনোদনের উন্মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই মেগা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই এর দৃশ্যমান কার্যক্রম শুরু হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হাসান মার্কেট। ছবি : সংগৃহীত

উল্লেখ্য, বিগত সরকারের আমলে শহরতলীর বাদাঘাটে নতুন ও আধুনিক কারাগার নির্মাণ করে সব বন্দি স্থানান্তর করা হয়েছিল। তখনকার সরকার পুরাতন স্থানে পার্ক করার পরিকল্পনা করলেও পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত বদলে সেটিকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) এলাকার আসামিদের রাখার জন্য পুনরায় সাব-জেল বা অস্থায়ী কারাগার হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।

সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর আমলে কারাগারের পাশ ঘেঁষে থাকা ঐতিহাসিক ‘ধোপাদিঘী’ সংস্কার করে চারপাশে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হলে এলাকাটি প্রতিদিন বিকেলে নগরবাসীর মিলনমেলায় পরিণত হয়। এখন পুরো কারাগারের জমিটি উন্মুক্ত পার্কে রূপান্তরিত হলে তা সিলেট নগরীর পরিবেশ ও নান্দনিকতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার সন্ধ্যায় নগরীর প্রবীণ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী জানান, বন্দরবাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘হাসান মার্কেট’-এর জায়গায় আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং সুবিধাসহ বহুতল অত্যাধুনিক সুপার মার্কেট নির্মাণ করা হবে।

সিসিক প্রশাসক স্পষ্ট করেন, “হাসান মার্কেট সিলেটের মূল বাণিজ্যিক ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে অবস্থিত। সময়ের চাহিদায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আধুনিক মার্কেট নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। তবে বর্তমান ব্যবসায়ীরা যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা বাস্তুচ্যুত না হন, সেটি সবার আগে অগ্রাধিকার পাবে।”

সিলেটের ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন। কারণ বিগত দুই দশকে হাসান মার্কেট পুনর্নির্মাণের বহু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি:

সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান এর সময়ে প্রথম বহুতল মার্কেটের পরিকল্পনা করা হয় এবং বর্তমান ব্যবসায়ীদের নিচতলার পজিশন নিশ্চিত রেখে ওপরের তলার পজিশন অগ্রিম বিক্রিও করা হয়েছিল। কিন্তু কাজ এগোয়নি। এরপরসাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী মেয়াদেও মার্কেট ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া হলে পরবর্তীতে তা স্থগিত হয়ে যায়।

ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আধুনিক মার্কেট ও পার্কিং গড়ে উঠলে বন্দরবাজারের দীর্ঘদিনের যানজট দূর হওয়ার পাশাপাশি নগরীর সার্বিক সৌন্দর্য বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

প্রসঙ্গত, ১৭৮৯ সালে বর্তমান সিলেট পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে, ৩ মার্চ ১৯৯৭ এ বাংলাদেশ সরকার এটিকে কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে উন্নীত করে।

ঐতিহ্যবাহী হাসান মার্কেট প্রথমে পার্ক ছিল। তখন সেটির নাম ছিল গোবিন্দ চরণ পার্ক। ১৯৫৮ সালে সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পশ্চিম পাকিস্তানের বাসিন্দা আলী হাসানের তত্ত্বাবধানে এ পার্কে একটি বিপণিবিতান নির্মাণ করা হয়। এরপর এটি ‘হাসান মার্কেট’ নামে পরিচিতি পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *