আগাম সবজি চাষে লাভের মুখ দেখছেন কানাইঘাটের আশিক

মৌসুম শুরুর আগেই মাঠে সবজি, বাজারে ভালো দাম—এই কৌশলেই কৃষিতে সাফল্যের গল্প লিখছেন সিলেটের কানাইঘাটের তরুণ কৃষক আশিকুর রহমান। প্রচলিত চাষাবাদের বাইরে গিয়ে আগাম সবজি উৎপাদন করে কয়েক বছর ধরে লাভের মুখ দেখছেন তিনি। তার সাফল্য দেখে কৃষির প্রতি নতুন করে আগ্রহী হচ্ছেন এলাকার বেকার যুবক এবং প্রান্তিক কৃষকরাও।

 

কানাইঘাট উপজেলার ৭নং দক্ষিণ বানীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ বাউর ভাগ পশ্চিম এলাকার মাঠে এখন আশিকুর রহমানের ব্যস্ততা। সারি সারি সবজি গাছের পরিচর্যায় সকাল থেকে মাঠে সময় কাটছে তার। কোথাও শসা, কোথাও লাউ, ঝিঙ্গা ও সীম—আবার কোনো জমিতে রয়েছে তরমুজ। আগাম উৎপাদনের কারণে বাজারে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার আশায় চলছে তার নিরলস পরিশ্রম।

 

সরেজমিনে তার জমিতে গিয়ে দেখা যায়, গাছের গোড়ায় মাটি দেওয়া, সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কারসহ নানান কাজে ব্যস্ত আশিক। কৃষির প্রতি তার আগ্রহ ও পরিকল্পিত চাষাবাদ চোখে পড়ার মতো। উৎপাদন খরচ কমিয়ে কীভাবে ভালো ফলন ও বাজারমূল্য পাওয়া যায়, সেই হিসাবেই এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

 

আশিকুর রহমান জানান, মৌসুমের শুরুতে বাজারে আগাম সবজির চাহিদা ও দাম বেশি থাকে। এ সুযোগ কাজে লাগাতেই তিনি আগাম সবজি চাষ শুরু করেন। জমি প্রস্তুত, উন্নতমানের বীজ নির্বাচন, সঠিক সময়ে সার ও সেচ প্রয়োগ এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে উৎপাদন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন তিনি।

 

তার কৃষি যাত্রার শুরু ২০২১ সালে। ওই বছর মাত্র ১৫ শতক জমিতে প্রথমবার তরমুজ চাষ করে প্রায় ৭০ হাজার টাকা লাভ করেন। পরের বছর ২০ শতক জমিতে চার জাতের তরমুজসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে লাভ করেন প্রায় ৮০ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ২ লাখ টাকা আয় করেন বলে জানান তিনি।

 

চলতি বছর তার চাষের পরিধি আরও বেড়েছে। প্রায় ৪ বিঘা জমিতে তরমুজ, শসা, জিঙ্গা, সীম ও লাউ চাষ করেছেন তিনি। এরই মধ্যে ক্ষেতের সবজি বিক্রিও শুরু হয়েছে।

 

আশিকুর রহমান বলেন, তার ক্ষেতে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম থাকায় সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও কম হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ কমেছে। বাজারে সবজির চাহিদা ও দাম ভালো থাকায় এবার গত দুই বছরের তুলনায় বেশি বিক্রির প্রত্যাশা করছেন তিনি।

 

তিনি বলেন, “কৃষিকে শুধু জীবিকা হিসেবে দেখলে হবে না। পরিকল্পনা ও পরিশ্রম দিয়ে কৃষিকেই লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করা সম্ভব। আগাম সবজি চাষে ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি ভালো বাজার পেলে লাভের সম্ভাবনাও অনেক বেশি।”

 

আশিকুর রহমান জানান, চাষাবাদের ক্ষেত্রে তিনি কানাইঘাট উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ ও সহযোগিতা পাচ্ছেন। রোগবালাই প্রতিরোধ, উৎপাদন বাড়ানো এবং আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ কাজে লাগাচ্ছেন তিনি।

 

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আশিকের সাফল্য এলাকায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তার চাষাবাদ দেখে অনেক কৃষক আগাম সবজি উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছেন। বিশেষ করে বেকার তরুণদের মধ্যে কৃষিকে ব্যবসা হিসেবে নেওয়ার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

 

কৃষকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসম্মত বীজ, কৃষি কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কানাইঘাটে বাণিজ্যিক সবজি চাষের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।

 

কানাইঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, “কানাইঘাটের সফল কৃষক আশিকুর রহমান তরমুজ, সাম্মামসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে আসছেন। তার সবজি চাষে উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তাকে দেখে এলাকার অনেকেই এখন সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।”

 

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, আগাম সবজি চাষ একদিকে যেমন কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানেরও সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। তবে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হতে পারেন।

 

কানাইঘাটের আশিকুর রহমানের গল্প তাই কেবল একজন কৃষকের সাফল্যের গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে—সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক কৃষি জ্ঞান আর পরিশ্রমকে কাজে লাগাতে পারলে কৃষিও হতে পারে লাভজনক উদ্যোগ। আর সেই উদ্যোগের পথ দেখিয়ে এখন অন্যদেরও স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তরুণ কৃষক আশিক।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:১৮
  • ১১:৫৬
  • ৪:২৩
  • ৬:১৪
  • ৭:২৯
  • ৫:৩৩