ডেঙ্গু এখন আর কোনো সাধারণ জ্বর না। এটা একটা যুদ্ধ। একটা মহামারি যা প্রতিবছর আমাদের ঘরে ঘরে ঢুকে আমাদের সন্তানদের কেড়ে নিচ্ছে, আর আমরা এখনো মশার কয়েল আর ফেসবুকে সচেতনতার পোস্ট দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছি।
কিন্তু আসলে এ যেন এক রক্তে লেখা পরিসংখ্যান।
গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ডেঙ্গু আর ঋতুকালীন রোগ নেই, এটা এখন বারোমাসি আতঙ্ক। ২০২৩ সালে এই দেশ ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি রোগী দেখেছে, মারা গেছে ১৭০০ এর বেশি মানুষ। পৃথিবীর ইতিহাসে এক বছরে ডেঙ্গুতে এত মৃত্যু আর কোথাও হয়নি। আমরা সেই লজ্জার রেকর্ডের মালিক।
২০২৪-২৫ সালেও চিত্র বদলায়নি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা – এখন আর ঢাকার রোগ না। আপনার মুলাইদের মতো গ্রামেও এখন এডিস মশা বাসা বাঁধছে। কারণ আমরা শহরের ডাস্টবিন গ্রামে নিয়ে গেছি। প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন বাড়ির জমে থাকা পানি – এগুলোই এখন এডিসের পাঁচ তারকা হোটেল।
একটা পরিসংখ্যান আপনাকে কাঁপিয়ে দেবে – ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা যায়, তাদের ৭০% মারা যায় হাসপাতালে পৌঁছানোর ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে। অর্থাৎ আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করি। জ্বরকে পাত্তা দিই না।
খুনিটা কে? শুধু মশা?
না। খুনি শুধু মশা না। খুনি আমরা নিজেরা। আমাদের অসভ্য, অপরিচ্ছন্ন, দায়িত্বজ্ঞানহীন মানসিকতা।
এডিস মশা ড্রেনের নোংরা পানিতে জন্মায় না। সে জন্মায় আপনার ঘরের স্বচ্ছ পানিতে। আপনার ফুলের টবে, ফ্রিজের পেছনের ট্রেতে, এসির পানিতে, ছাদে জমে থাকা এক ইঞ্চি পানিতে। অর্থাৎ সবচেয়ে পরিষ্কার মানুষের ঘরেই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মশার জন্ম।
আপনি সারাদিন ঘর ঝাড়ু দেন, কিন্তু ছাদে গিয়ে দেখেন না তিনদিনের বৃষ্টির পানি জমে সবুজ হয়ে আছে। আপনি বাচ্চাকে দামি স্কুলে পড়ান, কিন্তু স্কুলের পাশের নির্মাণাধীন ভবনের পানিতে লাখ লার্ভা কিলবিল করছে, সেটা নিয়ে একটা অভিযোগও করেন না।
আমরা সিটি কর্পোরেশনকে দোষারোপ করি, কিন্তু নিজের বাসার সামনের নালা নিজে পরিষ্কার করি না। আমরা সরকারের ফগার মেশিনের অপেক্ষায় থাকি, অথচ ফগার মশা মারে না, শুধু উড়ন্ত মশা তাড়ায়। লার্ভা মারতে হয় উৎস ধ্বংস করে। আর উৎসটা আপনার ঘরেই। এটা কঠোর সত্য – ডেঙ্গুতে আপনার সন্তান মারা গেলে, তার জন্য ৯০% দায়ী আপনি নিজে।
ডেঙ্গু জ্বরটা কেমন জানেন? প্রথম দুই দিন মনে হবে সাধারণ ভাইরাল জ্বর। তারপর শুরু হবে আসল তাণ্ডব।
হাড় ভাঙার মতো ব্যথা। চোখের পেছনে এমন ব্যথা যেন চোখ বের হয়ে আসবে। ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। এরপর হঠাৎ জ্বর কমে যাবে। আপনি ভাববেন সুস্থ হয়ে গেছে। আর এখানেই মৃত্যুর ফাঁদ।
জ্বর কমার পরের ২৪ ঘণ্টাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। এই সময় প্লাটিলেট ধসে পড়ে, রক্তের প্লাজমা লিক করতে শুরু করে। পেটে পানি জমে, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। নাক, দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ে। একজন সুস্থ মানুষ চোখের সামনে নিস্তেজ হয়ে যায়।
হাসপাতালে এমনও দেখা গেছে – ৯ বছরের একটা বাচ্চা, মায়ের কোলে শুয়ে আছে, তার মা বারবার বলছে “বাবা একটু পানি খা”। বাচ্চাটা পানি খেতে পারছে না, তার পেট ফুলে গেছে। তার রিপোর্টে প্লাটিলেট ১৫ হাজার। ডাক্তাররা দৌড়াচ্ছে। কিন্তু সময় নেই।
এই দৃশ্য কোনো পরিসংখ্যান না। এটা আমাদের ব্যর্থতা।
আমাদের ভুল চিকিৎসা, ভুল বিশ্বাস অনেক।আমরা যেনো এখনো মধ্যযুগেই পড়ে আছি। জ্বর হলেই প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ব্যথার ওষুধ খাওয়া – যেমন ডাইক্লোফেনাক, আইবুপ্রোফেন – এটা ডেঙ্গু রোগীকে সরাসরি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এটা রক্তক্ষরণ বাড়ায়।
পেঁপে পাতার রস খেলে প্লাটিলেট বাড়ে – এই ভুয়া তথ্য বিশ্বাস করে আমরা হাসপাতালে যেতে দেরি করি। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর কোনো গাইডলাইনে পেঁপে পাতার রস ডেঙ্গুর চিকিৎসা না। প্লাটিলেট বাড়ানোর একমাত্র উপায় শরীরকে হাইড্রেট রাখা এবং সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া।
আর সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে – প্লাটিলেট নিয়ে আতঙ্ক। প্লাটিলেট ১ লাখ থেকে ৮০ হাজারে নামলেই আমরা পাগল হয়ে রক্ত খুঁজি। অথচ ডাক্তাররা বলেন, প্লাটিলেট সংখ্যা না, রোগীর রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, পেটে ব্যথা আছে কিনা, বমি হচ্ছে কিনা – এগুলোই আসল বিপদচিহ্ন।
তাহলে বাঁচার উপায় কী?
আবেগ নয়, কঠোরতা দরকার। আবেগ দিয়ে ডেঙ্গু ঠেকানো যাবে না। দরকার নির্মম কঠোরতা। নিজের ঘরকে জেলখানা বানান মশার জন্য। প্রতি শুক্রবার ৩০ মিনিট। পুরো পরিবার নিয়ে বাড়ির প্রতিটি কোণা, ছাদ, বাথরুম, ফুলের টব, পানির ট্যাংক চেক করুন। এক ফোঁটা জমা পানি রাখবেন না। এটা করা এখন অবশ্য কর্তব্য। আপনার এলাকায় কেউ জমা পানি ফেলে রাখলে তাকে ছাড় দেবেন না। ছবি তুলে পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনে পাঠান। প্রয়োজনে জরিমানার ব্যবস্থা করুন। ভদ্রতা দেখানোর সময় শেষ। কারণ তার অবহেলায় আপনার সন্তান মরতে পারে।
জ্বরকে অবহেলা করবেন না। বর্ষাকালে জ্বর মানেই ডেঙ্গু ধরে নিয়ে পরীক্ষা করান। প্রথম দিনেই ডাক্তারের কাছে যান। প্রচুর তরল খান – ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, স্যুপ। এবং দিনে অন্তত ৬ বার প্রস্রাব হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখুন। স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, বাজারে সব জায়গায় এডিসের উৎস ধ্বংসের অভিযান চালাতে হবে। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না।
শেষ কথা হলো – ডেঙ্গু কোনো গরিবের রোগ না, কোনো বড়লোকের রোগও না। এটা অপরিচ্ছন্ন মানুষের রোগ। দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষের রোগ।
আজ যদি আপনি আপনার ছাদ পরিষ্কার না করেন, কাল হয়তো সেই ছাদের পানিতে জন্মানো মশার কামড়ে আপনার সবচেয়ে আদরের মানুষটাকে আইসিইউতে দেখতে হবে। তখন কান্না ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
তাই আসুন, কান্নার আগে ঘাম ঝরাই। মশারি টানানোর আগে মশার জন্ম বন্ধ করি।
কারণ একটা মশা মারলে একটা মশা মরে, কিন্তু একটা জমা পানি পরিষ্কার করলে হাজারটা মশার জন্ম বন্ধ হয়।



