আব্দুস সাদেক লিপন : হ্যারি পটার আমার কাছে রূপকথার কোনো চরিত্র ছাড়া আর কিছু নয়। এই কাল্পনিক চরিত্র বা তার ‘ভিশন অব ম্যাজিক’ নিয়ে আমার বিশেষ কোনো ধারণাও নেই, কিংবা আমি এর কোনো ভক্তও নই। বড় মেয়ের সাথে টিভিতে বসলে মাঝেমধ্যে কিছু অংশ চোখে পড়েছে—কিছুটা বুঝেছি, কিছুটা বা মাথার ওপর দিয়ে গেছে।
আমার বড় মেয়ে সামিরা সাদেক লিয়া, আদ্যোপান্ত হ্যারি পটার-এর একনিষ্ঠ ভক্ত। তার সংগ্রহে রয়েছে এই সিরিজের অনেক বই, হ্যারি পটারের হরেক রকমের পোশাক আর জাদুর লাঠি (Wand)। মেয়ের এই পাগলামি দেখে আমি মনে মনে হাসি। বয়স তো কম হলো না, তবুও একটা অবাস্তব কল্পনার জগৎ আর তার চরিত্রগুলোকে এমন পাগলপারা ভালোবেসে যাওয়া দেখে আমার বেশ অদ্ভুতই লাগে।
কয়েক দিন ধরে বাসায় শুরু হলো জোর জল্পনা-কল্পনা। লিয়া এসে কড়া নির্দেশ দিল, “আব্বু, আগামী ২২ তারিখ, বৃহস্পতিবার কোনো কাজ রাখা যাবে না। আমি টিকিট কেটেছি, তোমাকে আমার সাথে যেতে হবে।” কোথায় যাচ্ছি, কী জন্য যাচ্ছি—কিছুই না জেনে, শুধু মেয়ের চোখের আনন্দটুকু ধরে রাখতে হাসিমুখে বলে ফেললাম, “ঠিক আছে।” এমনকি আগের রাতে আমি কী পোশাক পরব, তাও সে নিজেই ঠিক করে দিল। সাদা শার্ট, কালো জিন্স আর সাদা ক্যানভাস জুতো। তার কথার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাধ্য কার! সেও ভালো করেই জানে, বাবারা মেয়েদের আবদারের কাছে
সবসময়ই হার মানতে বাধ্য। সাথে রয়েছে আমার ছোট মেয়ে নামিরা সাদেক পিয়াও।
অবশেষে এলো সেই কাঙ্খিত দিন। বিকেলে চারটার দিকে মেয়েদের পিছু পিছু ছুটলাম—বাস, ট্রেন আর আবার বাস। প্রায় দেড় ঘণ্টা যাত্রার পর এক বিশাল হলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাইরে কাপড়ের ব্যানারে লেখা—‘Harry Potter: Visions of Magic’। মেয়েদের চোখে-মুখে তখন আনন্দের ফোয়ারা ছুটছে। আমি মনে মনে মৃদু হাসলাম, তবে তাদের খুশিতে বাদ সাধিনি। ভুলেও জিজ্ঞেস করলাম না টিকিটের দাম কত নিয়েছে।
মেয়েদের অনুসরণ করে ভেতরে প্রবেশ করলাম। চারপাশ কালো কাপড়ে মোড়ানো; ভেতরে
ঢুকতেই একটা রহস্যময়, ভুতুড়ে ভাব ঘিরে ধরল। হাসিমুখের এক তরুণী আমাদের স্বাগত জানিয়ে বলল, টেবিল থেকে প্লাস্টিকের তৈরি জাদুর লাঠি যার যার একটা করে তুলে নিতে। আমি মেয়েদের দেখাদেখি একটি লাঠি হাতে নিলাম। “আব্বু, লাইট জ্বালাও!”—লিয়ার কথা মতো নির্দিষ্ট জায়গায় লাঠি দিয়ে ইশারা করতেই দেখি আশ্চর্যের ব্যাপার, লাঠির মাথায় দপদপ করে আগুন জ্বলে উঠল!
এরপর আমাদের একে একে বিভিন্ন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। কোথাও আলোর ঝলকানি, কোথাও অদ্ভুত সব জীবজন্তুর ছবি, আবার কোথাও পুরনো আমলের চেয়ার-টেবিল। হাতের জাদুর লাঠি দিয়ে সেগুলো ছুঁলেই কেমন জাদুকরি আলো জ্বলে উঠছে। বুঝতে পারলাম, হ্যারি পটার ছবির শুটিং স্পটের আদলে ভক্তদের জন্য এই জগতটি তৈরি করা হয়েছে। আমার বয়সে এই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ নতুন ও রোমাঞ্চকর। এক সুন্দর ও ব্যতিক্রমী বিকেল উপহার দেওয়ার জন্য মনে মনে লিয়াকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানালাম।
তবে সন্ধ্যার শেষ সারপ্রাইজটি বাকি ছিল ছোট মেয়ে পিয়ার কাছ থেকে। সে মিষ্টি হেসে বলল, “আজ তোমাদের আমি খাওয়াবো!” আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “তুমি তো এখনো ছোট, নিজে কামাই করো না, কীভাবে খাওয়াবে?” সে গর্বের সাথে জানাল, সে টাকা জমিয়েছে। আমি আর না করতে পারলাম না, শুধু বললাম, “প্যাকেট করে নাও, বাসায় গিয়ে তোমার আম্মু সহ আমরা সবাই মিলে একসাথে খাব।” সে খুশিমনে তাই-ই করল।
বড় হয়েও মেয়েদের সেই শিশুসুলভ উন্মাদনা আর বাবার প্রতি এমন নিবিড় ভালোবাসা আমার জীবনের ক্লান্তিগুলোকে যেন এক নিমিষে ধুয়ে দিল। কে জানে, হয়তো এই অবাস্তব জাদুকরী দুনিয়াটা আমার কাছে রূপকথা বৈ কিছু নয়, কিন্তু আমার মেয়েদের চোখে ঝিলমিল করা ওই আনন্দের হাসিটাই আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও সত্যি জাদু। যান্ত্রিক ব্যস্ততার ভিড়ে সেদিন ওই দুই কিশোরীর হাত ধরে হারিয়ে গিয়ে মনে হলো, বাবা হওয়ার চেয়ে মধুর আর কিছু হতে পারে না।
আব্দুস সাদেক লিপন
২৫ অক্টোবর ২০২৬
টরন্টো ,কানাডা ।
