নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত এবং মুমিনের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যা পৃথিবীকে মানুষের জন্য ইবাদতের উপযোগী করে দিয়েছে। তাই মুসলমানরা মসজিদ ছাড়াও ঘর, কর্মস্থল, খোলা মাঠ কিংবা সফরের পথে নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে কিছু স্থান আছে, যেখানে নামাজ আদায়কে শরিয়ত অপছন্দনীয় বা অনুপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করেছে। চলাচলের রাস্তা তার অন্যতম। কারণ রাস্তা মানুষের সাধারণ চলাচলের জন্য নির্ধারিত এবং সেখানে নামাজ আদায় করলে অন্যদের অসুবিধার কারণ হতে পারে। তাহলে প্রয়োজনের সময় রাস্তায় নামাজ আদায়ের বিধান কী? এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহবিদদের বক্তব্য কী বলে—তা জানা জরুরি।
পৃথিবীজুড়েই ইবাদতের সুযোগ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

جُعِلَتْ
لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا

‘সমগ্র পৃথিবীকে আমার জন্য সিজদার স্থান ও পবিত্রতার মাধ্যম বানানো হয়েছে।’ (বুখারি ৪৩৮, মুসলিম ৫২১)

অপবিত্রতা, নাপাকি কিংবা শরিয়তবিরোধী কোনো কারণ না থাকলে মুসলমান পৃথিবীর প্রায় যেকোনো স্থানে নামাজ আদায় করতে পারেন।

যেসব স্থানে নামাজ আদায় নিষিদ্ধ বা অনুপযুক্ত

তবে কিছু স্থান রয়েছে, যেখানে নামাজ আদায় করতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিষেধ করেছেন। তাহলো—

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাতটি স্থানে নামাজ আদায় করতে নিষেধ করেছেন—

১. ময়লা ফেলার স্থান

২. কসাইখানা

৩. কবরস্থান

৪. চলাচলের রাস্তা

৫. গোসলখানা

৬. উটের আস্তাবল


. বায়তুল্লাহর ছাদ।’ (তিরমিজি ৩৪৬)

ফকিহদের মতে, এসব স্থানে নিষেধাজ্ঞার কারণ হলো অপবিত্রতা, অপরিচ্ছন্নতা, শিরকের আশঙ্কা অথবা মানুষের অসুবিধা সৃষ্টি হওয়া।

চলাচলের রাস্তায় নামাজ আদায়ের বিধান

মানুষের চলাচলের জন্য নির্ধারিত রাস্তায় নামাজ আদায় করলে স্বাভাবিক যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটে। তাই বিকল্প স্থান থাকা সত্ত্বেও
রাস্তায় নামাজ আদায় করা শরিয়তের দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য নয়।

এ প্রসঙ্গে ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো—

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ

‘নিজে ক্ষতির শিকার হওয়া যাবে না এবং অন্যের ক্ষতির কারণও হওয়া যাবে না।’ (ইবনে মাজাহ ২৩৪১)

অতএব, এমনভাবে নামাজ আদায় করা উচিত নয়, যাতে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়।

জুমা ও ঈদের নামাজে ব্যতিক্রমী বিধান

জুমা ও ঈদের নামাজে মুসল্লির সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় প্রায়ই মসজিদের ভেতরে জায়গার সংকুলান হয় না। অনেক
সময় রাস্তায় না দাঁড়ালে নামাজই ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের অনুমতি রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে—

> প্রথমে মসজিদের ভেতরে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।

> মসজিদে পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় নামাজ আদায় করা যাবে না।

> রাস্তায় দাঁড়ালে পথচারীদের চলাচলের জন্য কিছু জায়গা খালি রাখতে হবে।

> জুমার নামাজ আদায় করলে ফরজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা ছেড়ে দিতে হবে।

> সুন্নত নামাজ, জিকির বা দোয়ার জন্য রাস্তা আটকে রাখা যাবে না।

> ঈদের নামাজের ক্ষেত্রেও নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই রাস্তা খালি করে দিতে হবে।

> খুতবা শুনতে হলে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে হবে অথবা রাস্তার পাশে অবস্থান করতে হবে।

আলেমদের ফতোয়া কী বলে?

ভারতের নদওয়াতুল উলামার দারুল ইফতা থেকে দেওয়া এক ফতোয়ায় বলা হয়েছে, বিকল্প জায়গা না পা
ওমাজ শুদ্ধ হবে।

তবে তার আগে মুসল্লিকে এমন কোনো মসজিদে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে, যেখানে পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। প্রথম মসজিদে জায়গা না হলে অন্য মসজিদে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

সেখানেও জায়গা না পাওয়া গেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেবল জুমার দুই রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করা যাবে। সুন্নত নামাজ, নফল এবং দোয়া-দরুদ অন্য কোনো স্থানে গিয়ে সম্পন্ন করতে হবে।

কুরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا

‘নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য। অতএব তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে আহ্বান করো না।’ (সুরা আল-জিন: আয়াত ১৮)

এই আয়াত মুসলমানদের ইবাদতের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা রক্ষার শিক্ষা দেয়। নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রেও এমন স্থান নির্বাচন করতে হবে, যা ইবাদতের মর্যাদা রক্ষা করে এবং মানুষের কষ্টের কারণ হয় না।

ইসলাম একদিকে যেমন নামাজ আদায়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে, অন্যদিকে মানুষের অধিকার ও জনস্বার্থের প্রতিও সমান গুরুত্ব আরোপ করেছে। তাই সাধারণ অবস্থায় চলাচলের রাস্তায় নামাজ আদায় থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে জুমা বা ঈদের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে, যখন বিকল্প কোনো ব্যবস্থা থাকে না, তখন শরিয়ত প্রয়োজনের ভিত্তিতে রাস্তায় নামাজ আদায়ের অনুমতি দিয়েছে। শর্ত হলো— মানুষের চলাচলে অযথা বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না এবং নামাজ শেষে দ্রুত রাস্তা খালি করে দিতে হবে। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব— উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে।

 

ইসলাম/হা

 

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৩৯
  • ১১:৫৪
  • ৪:২৯
  • ৬:৪০
  • ৮:০৫
  • ৫:০৪