অস্ট্রেলিয়ায় মাটির নিচের সেই বিখ্যাত পাতাল শহরটির নাম কুবার পেডি। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমির প্রান্তে অবস্থিত এ শহরটি বিশ্বের একমাত্র সম্পূর্ণ কার্যকরী ভূগর্ভস্থ শহর, যেখানে তীব্র গরম থেকে বাঁচতে মানুষ মাটির নিচে আধুনিক জীবনযাপন গড়ে তুলেছেন|
মরুভূমির গনগনে আঁচ থেকে বাঁচতে মানুষ যে এমন এক রূপকথা তৈরি করতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। অস্ট্রেলিয়ার রুক্ষ ‘আউটব্যাক’ অঞ্চলে অবস্থিত এক অদ্ভুত শহর কুবার পেডি। দেখলে মনে হবে ধু-ধু মরুভূমি, যেন মঙ্গলের পিঠ। কিন্তু আসল ম্যাজিক লুকিয়ে আছে মাটির নিচে। সেখানে আস্ত একটা শহর বুক পেতে রেখেছে।

আজ থেকে এক শতাব্দী আগে, ১৯১৫ সালে সোনা খুঁজতে এসে ১৪ বছরের এক কিশোর আচমকা পেয়ে যায় ওপাল বা দুর্মূল্য রত্নপাথর। ব্যস! বদলে গেল ইতিহাস। এরপর দলে দলে মানুষ ভিড় জমাল এই রুক্ষ প্রান্তরে। আজ কুবার পেডি বিশ্বের বৃহত্তম ওপাল খনি অঞ্চল। সারা পৃথিবীর বেশিরভাগ ওপাল মেলে এ মাটির নিচ থেকেই।

বাইরে থেকে দেখলে শুধু কতগুলো পাইপ চোখে পড়ে, যা আসলে সুড়ঙ্গঘরের হাওয়া চলাচলের রাস্তা। কিন্তু নিচে নামলেই চক্ষু চড়কগাছ! মাটির তলার এই বাড়িগুলোকে বলা হয় ‘ডাগআউট’। আধুনিক রান্নাঘর, বিলাসবহুল বাথরুম, হাইস্পিড ইন্টারনেট থেকে শুরু করে সুইমিংপুল— কী নেই সেখানে! বেলেপাথরের গোলাপি দেওয়ালগুলো এমনভাবে পালিশ করা, যাতে ধুলো না ওড়ে।

এখানে শুধু থাকার ঘর নয়, চার্চ থেকে শুরু করে মিউজিয়াম— সবই মাটির নিচে। এখানকার সার্বিয়ান অর্থোডক্স চার্চের পাথুরে দেওয়ালে খোদাই করা সাধুদের মূর্তি এক স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরি করে। আবার ক্যাথলিক চার্চের কৃত্রিম আলোয় আলোকিত রঙিন কাচ এক মায়াবী আবহ তৈরি করে। উমুনা ওপাল মাইন্ড অ্যান্ড মিউজিয়ামে গেলে খনির ইতিহাস নিজের চোখে দেখা যায়।

ওপরের রুক্ষ জমিতে ঘাসের নামনিশানা নেই। ধুলাবালি আর শক্ত লাল মাটির ওপরেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত গলফ কোর্স। খরতাপ এড়াতে এখানে খেলা হয় রাতে, ফ্লাডলাইটের আলোয়। খেলোয়াড়রা কৃত্রিম ঘাসের টুকরো ব্যবহার করেন শট মারার জন্য। আর বলগুলো অন্ধকারে জোনাকির মতো জ্বলজ্বল করে। এ অভিজ্ঞতা সত্যিই রসিক খেলোয়াড়দের জন্য এক দারুণ প্রাপ্তি।

কুবার পেডির এ অতিপ্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপ দেখে বারবার মজেছে হলিউড। ১৯৮৫ সালের বিখ্যাত ছবি ‘ম্যাড ম্যাক্স বিয়ন্ড থান্ডারডোম’-এর শুটিং হয়েছিল এই খনি অঞ্চলের বুকে। কোনো কৃত্রিম সেটের প্রয়োজনই পড়েনি এখানে। এ ছাড়া ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অফ প্রিসিলা’ ছবিরও বেশ কিছু দৃশ্য ধারণ করা হয় আসল ডাগআউটের ভেতরে। এই শহর যেন এক চিরন্তন সিনেমার সেট।

ভারত থেকে সিঙ্গাপুর বা দুবাই হয়ে প্রথমে পৌঁছাতে হবে অ্যাডিলেড। সেখান থেকে বিমানে বা সড়কপথে স্টুয়ার্ট হাইওয়ে ধরে কুবার পেডি যাওয়া যায়। ভারতীয়দের জন্য ‘সাবক্লাস ৬০০’ ট্যুরিস্ট ভিসা প্রয়োজন। মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসের শীতকালটাই এখানে ঘোরার সেরা সময়। থাকার জন্য বেছে নিতে পারেন ‘ডেজার্ট কেভ হোটেল’-এর মতো মাটির তলার বিলাসবহুল ঘর।

যারা গতানুগতিক সমুদ্র কিংবা পাহাড় দেখে ক্লান্ত, তাদের জন্য কুবার পেডি এক পরম বিস্ময়। এখানে ৫০টিরও বেশি দেশের মানুষ একসঙ্গে মিলেমিশে থাকেন। এটি কেবল এক আশ্চর্য পর্যটন কেন্দ্র নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে প্রাকৃতিক উপায়ে কীভাবে ঠান্ডা থাকা যায়, তার এক জ্যান্ত উদাহরণ। এখান থেকে ফেরার পথে পকেটে করে নিয়ে আসতে পারেন খাঁটি ওপাল।

 

প্রবাস/হা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *