সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার দরবস্ত বাজারে স্কুলছাত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলার প্রধান আসামি মাহবুবুর রহমানকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন চারিকাটা এলাকাবাসী। ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, দুটি মামলায় আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে আসামি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, জৈন্তাপুর মডেল থানায় দায়ের হওয়া আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলাটির নম্বর ১১, তারিখ ২৬ জুন ২০২৪। দণ্ডবিধির ৩০৬/৩৪ ধারায় মামলাটি দায়ের করেন জৈন্তাপুর উপজেলার সরুখেল গ্রামের বাসিন্দা সুলতান করিম। মামলায় আসামি করা হয়েছে চতুলবাজার-সরুখেল গ্রামের মাহবুবুর রহমান (২৩), তার পিতা শামসুল করিম (৫০) ও বড় ভাই মারুফ আহমদ (২৭)-কে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, মামলার বাদী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সুলতান করিম ২৪ জুন ২০২৪ তারিখে তার মেয়ে মাইসা করিম ও জামাতা মিনহাজ হোসেনকে নিজ বাড়িতে দাওয়াত করেন। রাতে জামাতা চলে গেলেও মাইসা ও অন্যান্য আত্মীয়রা বাড়িতেই ছিলেন। পরদিন ২৫ জুন ভোররাতে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়লে ভোর ৪টার দিকে মাইসা বাথরুমে যান। সকাল ৭টার দিকে বাদীর স্ত্রী মেয়েকে ডাকতে গিয়ে শোবার ঘরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় তাকে দেখতে পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
বাদীর অভিযোগ, ১ নম্বর আসামি মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে তার মেয়ে মাইসা করিমের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে পরিবার মাইসার অন্যত্র বিয়ে দেয়। অভিযোগ করা হয়, মাহবুবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা ওই বিয়ে মেনে নিতে পারেননি। মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, মাহবুবুর রহমান মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মাইসাকে মানসিকভাবে চাপ, ব্ল্যাকমেইল ও বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেন। তার পিতা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধেও গালিগালাজ ও প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মামলাটির তদন্ত শেষে জৈন্তাপুর মডেল থানা পুলিশ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযোগপত্র নং- ১৫০। তদন্ত প্রতিবেদনে আসামিদের পারস্পরিক পারিবারিক সম্পর্ক, মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে মাইসা করিমের কথিত প্রেমের সম্পর্ক এবং মাইসার অন্যত্র বিয়ের পর সৃষ্ট বিরোধের বিষয় উল্লেখ করা হয়। একই দিনে অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন বলে জানা গেছে।
এদিকে মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কোতোয়ালি মডেল থানার জিআর মামলা নং ৬৭/২০২২, থানার মামলা নং ১০। মামলাটির ঘটনার তারিখ ৫ মার্চ ২০২২। পরবর্তীতে ৭ মার্চ ২০২২ তারিখে মামলাটি থানা হইতে প্রেরণ করা হয়। মামলাটি তৎকালীন সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর ২৫, ২৯ ও ৩১ ধারায় দায়ের করা হয়।
মামলাটির তদন্ত শেষে পুলিশ ৮ মে ২০২৪ তারিখে অভিযোগপত্র নং ১০৯ দাখিল করে। মামলায় কিছুদিন কারাভোগের পর মাহবুবুর রহমান জামিনে মুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি পলাতক রয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এ মামলাতেও তার বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, দুটি মামলাতেই মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করায় বর্তমানে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান পুলিশের এক কর্মকর্তা।
অন্যদিকে দীর্ঘদিনেও আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় সরুখেল ও চতুলবাজার এলাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি এলাকার সর্বস্তরের মানুষ মাহবুবুর রহমানকে গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিতে মানববন্ধন করেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, একজন কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আসামি দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করছেন- এটি এলাকাবাসীর জন্য উদ্বেগের বিষয়। তারা দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে এনে গ্রেপ্তার এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
মানববন্ধনে জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
