ভূমধ্যসাগরে রুশ জাহাজডুবি ঘিরে ‘পারমাণবিক রহস্য’

রাশিয়ার কার্গো জাহাজ ‘উরসা মেজর’-এর ডুবে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে। ভূমধ্যসাগরের প্রায় আড়াই হাজার মিটার গভীরে ডুবে থাকা জাহাজটি কী ধরনের মালামাল বহন করছিল, কেন এটি রাশিয়ার বন্দর ছেড়ে ইউরোপ ঘুরে অস্বাভাবিক রুটে যাত্রা করেছিল এবং কীভাবে একাধিক বিস্ফোরণের পর এটি সমুদ্রের তলায় তলিয়ে গেল—এসব প্রশ্ন ঘিরে নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জাহাজটি সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার উদ্দেশে রাশিয়ার সাবমেরিনে ব্যবহৃত দুটি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের উপাদান বহন করছিল। আর সে কারণেই এটি হয়তো আন্তর্জাতিক গোপন সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল।

ঘটনার শুরু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। জাহাজটি ফিনল্যান্ড উপসাগরের ইউস্ট-লুগা বন্দরে জ্বালানি সংগ্রহ করে এবং পরে সেন্ট পিটার্সবার্গের ডকে মালামাল বোঝাই করে। সরকারি নথিতে বলা হয়েছিল, জাহাজটি ভ্লাদিভস্তকের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে এবং এতে রয়েছে ১২৯টি খালি শিপিং কন্টেইনার, দুটি বড় লিবহার ক্রেন এবং দুটি বড় ‘ম্যানহোল কভার’। কিন্তু সেই ঘোষিত পণ্যের আড়ালে কী লুকিয়ে ছিল তা এখন পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয়।

সিএনএন বিশ্লেষণ করেছে জাহাজ মালিক ওবোরোনলজিস্টিক্সের পোস্ট করা টাইম-ল্যাপস ভিডিও ফুটেজ, যেখানে দেখা যায় ইউস্ট-লুগায় কন্টেইনারগুলো জাহাজের হুলের ভেতরে সাজানো হচ্ছে এবং নিচে একটি ফাঁকা জায়গা রাখা হচ্ছে, ঠিক যেখানে পরবর্তীতে ‘ম্যানহোল কভার’ দুটি বসানো হবে। এ পর্যবেক্ষণটি সন্দেহের নতুন মাত্রা যোগ করে। রাশিয়ারঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান ‘ওবোরোনলজিস্টিকস’, যারা জাহাজটির মালিক, তারাই কয়েক মাস আগে জানিয়েছিল যে তাদের জাহাজ পারমাণবিক উপাদান পরিবহনের লাইসেন্স পেয়েছে।

১১ ডিসেম্বর বন্দর ছেড়ে জাহাজটি ফ্রান্সের উপকূল বরাবর দক্ষিণমুখে এগোতে থাকে। পর্তুগালের নৌবাহিনীর বিমান ও জাহাজ এটিকে পর্তুগিজ জলসীমা পার হওয়া পর্যন্ত অনুসরণ করে। দুটি রুশ সামরিক জাহাজ ‘ইভান গ্রেন’ ও ‘আলেক্সান্ডার ওত্রাকভস্কি’ এসকর্ট দিচ্ছিল ‘আর্সা মেজর’-কে। ২২ ডিসেম্বরের সকালে পর্তুগালের নৌবাহিনী জাহাজটির পিছু ছাড়ে। এর ঠিক চার ঘণ্টা পরে, স্পেনের জলসীমায় ঢুকতেই জাহাজটি হঠাৎ গতি কমিয়ে দেয়। স্পেনের উদ্ধারকর্মীরা যোগাযোগ করলে জাহাজ থেকে জানানো হয় সব ঠিকঠাক আছে।

কিন্তু ঠিক ২৪ ঘণ্টা পরে ঘটে বিপর্যয়। ২৩ ডিসেম্বর বেলা ১১টা ৫৩ মিনিটে (ইউটিসি) জাহাজটি হঠাৎ গতিপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে জরুরি সাহায্যের আহ্বান জানায়। জাহাজের ডান দিকে, সম্ভবত ইঞ্জিন রুমের কাছে পরপর তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মারা যান দ্বিতীয় মেকানিক নিকিতিন ও মেকানিক ইয়াকোভলেভ, যাদের মৃতদেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। জাহাজটি একদিকে হেলে যায় এবং চলার শক্তি হারায়।

বেঁচে থাকা ১৪ জন ক্রু সদস্য লাইফবোটে সরে পড়েন এবং পরে স্পেনের উদ্ধারকারী জাহাজ ‘সালভামার ড্রাকো’ তাদের তুলে নেয়। বিকালে স্পেনের একটি সামরিক জাহাজ ঘটনাস্থলে আসে। কিন্তু আধঘণ্টার মধ্যেই এসকর্টে থাকা রুশ যুদ্ধজাহাজ ‘ইভান গ্রেন’ আশেপাশের সব জাহাজকে দুই নটিক্যাল মাইল দূরে সরে যেতে এবং উদ্ধার হওয়া ক্রুদের ফিরিয়ে দিতে বলে। স্পেনের কর্তৃপক্ষ এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে। তার হেলিকপ্টার পাঠায় জাহাজে বেঁচে থাকা কেউ আছে কিনা খোঁজ নিতে। উদ্ধারকর্মীরা জাহাজের ইঞ্জিন রুম সিলবদ্ধ পায় এবং কন্টেইনারের ভেতরে শুধু জঞ্জাল, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম দেখতে পায়।

উদ্ধার হওয়া ১৪ জন ক্রুকে কার্টাজেনা বন্দরে আনা হলে স্পেনের পুলিশ ও তদন্তকারীরা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ক্যাপ্টেন ইগর আনিসিমভ শুরুতে জাহাজের পণ্যবাহী বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকার করেন। কারণ তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। কিন্তু চাপ বাড়লে তিনি স্বীকার করেন যে, ওই ‘ম্যানহোল কভার’ আসলে সাবমেরিনে ব্যবহারযোগ্য দুটি পারমাণবিক চুল্লির উপাদান। সেগুলোতে পারমাণবিক জ্বালানি আছে কিনা তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। ক্যাপ্টেনের বিশ্বাস ছিল, জাহাজটিকে উত্তর কোরিয়ার রাসন বন্দরে পাঠানো হবে।

স্পেনের তদন্তে উঠে আসে আরও এক অদ্ভুত তথ্য, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ভ্লাদিভস্তকে মালামাল পৌঁছে দিতে এই সুদীর্ঘ সামুদ্রিক পথে একটি জাহাজ পাঠানোর কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই, যেখানে বিশাল রেল নেটওয়ার্ক রাশিয়াকে সংযুক্ত রেখেছে। তদন্তকারীরা মনে করেন, জাহাজে থাকা ক্রেনগুলো রাসনে পৌঁছে সেই সংবেদনশীল পণ্য নামানোর কাজে ব্যবহারের জন্য নেয়া হয়েছিল।

জাহাজের হুলে পাওয়া গেছে ৫০ সেন্টিমিটার বাই ৫০ সেন্টিমিটারের গর্ত, যার ধাতব প্রান্তগুলো ভেতরের দিকে বাঁকানো। অর্থাৎ আঘাতটি বাইরে থেকে এসেছে এবং ভেতরের দিকে প্রবেশ করেছে। জাহাজের ডেকে পাওয়া গেছে ছড়ানো-ছিটানো শ্রাপনেল। স্পেনের তদন্তে বলা হয়, এই গর্তটি সম্ভবত ‘ব্যারাকুডা সুপারক্যাভিটেটিং টর্পেডো’ দিয়ে করা হয়েছে। এটি এক ধরনের অত্যাধুনিক ও অত্যন্ত বিরল অস্ত্র, যা পানির মধ্যে সামনে বায়ু নিক্ষেপ করে প্রতিরোধ কমিয়ে অতিদ্রুত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কিছু ন্যাটো মিত্র, রাশিয়া ও ইরান ছাড়া আর কারো কাছে এ ধরনের টর্পেডো নেই। তবে অন্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ‘এটি আসলে লিম্পেট মাইনের কাজ হতে পারে।’

ঘটনার এক সপ্তাহ পরে রুশ সামরিক বাহিনী আবার সেই জায়গায় ফিরে আসে। রাশিয়ার গোয়েন্দা জাহাজ হিসেবে পরিচিত ‘ইয়ান্তার’ পাঁচ দিন ধরে ‘আর্সা মেজরের’ ধ্বংসাবশেষের ওপর অবস্থান করে। এরপর সমুদ্রের তলদেশে আরো চারটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, যা সম্ভবত জাহাজের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করার জন্য করা হয়েছিল।

সিএনএন বলছেন, ঘটনার গভীরে গেলে যে তথ্য পাওয়া যায় তা আরো উদ্বেগজনক। মার্কিন বিমান বাহিনীর বিরল ও অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘নিউক স্নিফার’ বিমান (আনুষ্ঠানিক নাম ডব্লিউসি-১৩৫আর), যা সাধারণত রুশ আর্কটিক বা ইরানের আশেপাশে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করতে গোপনে ব্যবহার করা হয় সেগুলো ডুবে যাওয়া জাহাজের ঠিক উপর দিয়ে দুবার উড়েছে। একবার ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট, আরেকবার চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি। বিমানটির ঘাঁটি নেব্রাস্কার অফুট বেসের মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে, এই বিমানটি সাধারণত পারমাণবিক ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজে ব্যবহৃত হয়।

জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ প্রায় আড়াই হাজার মিটার গভীরে ভূমধ্যসাগরের তলদেশে পড়ে আছে। স্পেন সরকার বলছে, এত গভীরে ডেটা রেকর্ডার উদ্ধার করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, কারণ আধুনিক ব্ল্যাক বক্স সাধারণত ভেসে উঠে নিজের অবস্থান জানান দেয়।

এই পুরো ঘটনার পটভূমিতে রয়েছে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক। ২০২৪ সালের অক্টোবরে কিম জং উন ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে লড়াইয়ে সাহায্য করতে অন্তত ১০ হাজার সেনা পাঠান। তদন্তে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সম্ভবত এই পারমাণবিক চুল্লিগুলো রাশিয়ার ডেল্টা-৪ শ্রেণির ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিনে ব্যবহৃত ভিএম-৪এসজি মডেলের। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে উত্তর কোরিয়া তার প্রথম পারমাণবিক সাবমেরিনের ছবি প্রকাশ করেছে, যদিও ভেতরে কার্যকর পারমাণবিক চুল্লি ছিল কিনা তার কোনো প্রমাণ এখনো নেই।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মাইক প্লানকেট বলেছেন, ‘এ ধরনের প্রযুক্তি হস্তান্তর কেবল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যেই হয়, এটি কখনো হালকাভাবে নেয়ার বিষয় নয়। সত্যি যদি রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক সাবমেরিন প্রযুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক হুমকি।’

তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে পেন্টাগন। রুশ, স্পেনীয় ও ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীও সাড়া দেয়নি। কিন্তু একাধিক পশ্চিমা নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা ঘটনাটিকে ‘অদ্ভুত’ বলেছেন। কেউ কেউ তদন্তের কিছু উপসংহারকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলেছেন। তবে কেউই ঘটনার বিকল্প কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৫৩
  • ১১:৫৩
  • ৪:২৫
  • ৬:২৭
  • ৭:৪৮
  • ৫:১৪