
মাঠের হাই-প্রেসিং ট্যাকটিক্স থেকে শুরু করে চুলচেরা অফসাইডের সিদ্ধান্ত—এবার সবখানেই ব্যবহার হতে যাচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপে এবার খেলা চলাকালীনই মিলবে নিখুঁত লাইভ অ্যানালাইসিস। এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণকেই সহজ করবে না, বরং পাল্টে দেবে মাঠের রণকৌশলও।
আসন্ন বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ রূপ নিয়ে হাজির হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। রিয়েল-টাইম ডেটা মডেল এবং লাইভ থ্রিডি সিমুলেশনের হাত ধরে এবারের টুর্নামেন্ট বদলে দেবে ম্যাচ স্ট্র্যাটেজি ও স্টেডিয়ামের পুরো আবহ। অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলই পাবে নিজস্ব এআই মডেলের অ্যাক্সেস। এর মাধ্যমে ভিডিও ক্লিপ এবং থ্রিডি অ্যাভাটারের সাহায্যে প্রতিপক্ষের খেলার ধরন নিয়ে মুহূর্তেই কাটাছেড়া করতে পারবেন বিশ্লেষকেরা। কোচেরা দেখতে পাবেন তাদের ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তনগুলো পরবর্তী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর হবে। অন্যদিকে, খেলোয়াড়রা পাবেন একদম নিজস্ব বা পার্সোনালাইজড ম্যাচ অ্যানালাইসিস।
ফিফার প্রযুক্তিগত অংশীদার লেনোভোর তৈরি এই ‘ফুটবল এআই প্রো’ সিস্টেমটি কোটি কোটি ফিফা ডেটা পয়েন্ট এবং ২,০০০-এরও বেশি ফুটবল-সম্পর্কিত মেট্রিক বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। ব্যাংক অব আমেরিকা (বিওএফএ) গ্লোবাল রিসার্চের একটি নোটে বলা হয়েছে, ‘অতীতে ধনী দলগুলো প্রযুক্তির দিক থেকে যে বাড়তি সুবিধা পেত, ২০২৬ সালে এই এআই প্রযুক্তি ডেটার সেই বৈষম্য ঘুচিয়ে দেবে এবং প্রতিটি দলকেই সমানে-সমান সুযোগ এনে দেবে।’
কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিতব্য এবারের মহাযজ্ঞে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মাত্র এক সেকেন্ডে খেলোয়াড়দের শরীরী গঠন ডিজিটাল স্ক্যান করে তৈরি করা হবে নিখুঁত থ্রিডি সংস্করণ। ফলে অফসাইডের সিদ্ধান্তগুলো হবে আরও নির্ভুল।
এমনকি ১৬টি স্টেডিয়ামের প্রতিটিরই থাকছে একটি করে ‘ডিজিটাল টুইন’ বা লাইভ ভার্চুয়াল কপি। এর মাধ্যমে গ্যালারির ভিড়, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পরিধানযোগ্য ডিভাইস থেকে খেলোয়াড়দের রিয়েল-টাইম স্বাস্থ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে। স্যানডিস্ক-এর হিসেব মতে, এবার ৯০০ পেটাবাইট ডেটা তৈরি হবে, যা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের চেয়ে প্রায় ৪৫ গুণ বেশি! বিওএফএ-এর রিসার্চ টিমের ভাষ্যমতে, ‘২০২৬ বিশ্বকাপই প্রথম টুর্নামেন্ট, যেখানে ডেটা নিজেই একটি মূল পণ্য। আমরা একটি বিশাল, রিয়েল-টাইম সিমুলেশন দেখতে যাচ্ছি যেখানে প্রতি সপ্তাহে কয়েক পেটাবাইট হারে ভৌত জগতকে ডেটার আয়নায় রূপান্তর করা হচ্ছে।’
স্টেডিয়াম প্রযুক্তির বাইরে এবার দেখা মিলবে স্বয়ংক্রিয় যানের (রোবোট্যাক্সিস) মেলা, যার সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করবে আমেরিকান সফটওয়ার কোম্পানি ওয়েমো। পাশাপাশি হুন্দাই এবং মেক্সিকো প্রশাসন মাঠে নামাচ্ছে বোস্টন ডায়নামিক্সের ‘অ্যাটলাস’ ও ‘স্পট’-এর মতো হিউম্যানয়েড ও রোবট কুকুর, যা নিরাপত্তা ও স্টেডিয়াম লজিস্টিকসে সাহায্য করবে।
খেলাধুলায় এআই-এর এই জয়যাত্রা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যাকাউন্টিং ফার্ম পিডব্লিউসি তাদের একটি নোটে বলে, ‘এর লক্ষ্য গ্যালারির গর্জন কিংবা একজন দক্ষ কোচের সহজাত প্রতিভাকে প্রতিস্থাপন করা নয়। বরং মানুষকে তার সেরা কাজটি—অনুপ্রেরণা দেয়া, নেতৃত্ব দেয়া এবং সংযোগ তৈরি করায় আরও মনোযোগী করে তোলা। খেলাধুলার চিরন্তন জাদু নষ্ট করা নয়, বরং এআই এর রোমাঞ্চকে আরও বাড়িয়ে দেবে।’