বিশ্বাসের নামে শত কোটি লোপাট?

সাঈদীপুত্রের ‘ইস্তানবুল রিসোর্টে’ বড় জালিয়াতি

সাঈদীপুত্রের ‘ইস্তানবুল রিসোর্টে’ বড় জালিয়াতি

পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর বহুল আলোচিত ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ প্রকল্পকে ঘিরে এক চাঞ্চল্যকর অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি ৩০ বিঘা জমির গালগল্প শুনিয়ে হাজার হাজার শেয়ার বিক্রি করলেও বাস্তবে তাদের মালিকানায় রয়েছে এর পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম জমি। শুধু আর্থিক গরমিলই নয়, প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত জমি নিয়েও দেখা দিয়েছে চরম আইনি ও মালিকানা জটিলতা।

৩০ বিঘার গল্প শুনিয়ে শেয়ার বাণিজ্য

৩০ বিঘা জমির ওপর বিশাল লাক্সারিয়াস হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়ে পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর মালিকানাধীন ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির নামে কুয়াকাটায় রেজিস্ট্রিকৃত জমি রয়েছে মাত্র ১.৯২ একর বা ৫.৭৪ বিঘা—যা তাদের দাবিকৃত জমির পাঁচ ভাগের এক ভাগও নয়।

এমনকি প্রয়োজনীয় জমি নিজের নামে নিশ্চিত না করেই, গত ৭ জানুয়ারি কুয়াকাটা পৌরসভা থেকে মাত্র ৬ বিঘা জমির ওপর হোটেল নির্মাণের একটি প্রাথমিক অনুমোদন নেয় প্রতিষ্ঠানটি। অথচ এই অনুমোদন পাওয়ারও ছয় মাস আগে থেকেই ৩০ বিঘার অবাস্তব গল্প শুনিয়ে বাজারে শেয়ার বিক্রি শুরু করে ইস্তানবুল কর্তৃপক্ষ।

কাগজের জমি দেখিয়ে টাকা লোপাট

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইস্তানবুল কর্তৃপক্ষ তাদের কল্পিত ৩০ বিঘা প্রকল্পটিকে মোট ৪৩ হাজার ৬০০টি শেয়ারে ভাগ করেছে, যা বিক্রির জন্য ২৬ হাজার প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১০ হাজার প্যাকেজে অন্তত ২২ হাজার শেয়ার বিক্রিও হয়ে গেছে। অর্থাৎ, নিজেদের অধীনে মাত্র পৌনে sechs (৬) বিঘা জমি থাকলেও, এর চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ জমির ভুয়া শেয়ার বিক্রি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা পকেটে ভরছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ বিষয়ে ইস্তানবুল হোটেলের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার মো. রাকিবুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ২১ বিঘা জমি কেনা হয়েছে এবং বাকি ৯ বিঘার বায়না করা হয়েছে। তবে এর পক্ষে কোনো দলিল তিনি দেখাতে পারেননি। উল্টো ক্রেতারূপী প্রতিবেদকের কাছে কাগজপত্র দেখানোর বিষয়ে গড়িমসি করে বলেন, “যারা নিচ্ছে বিশ্বাস করেই বুকিং মানি দিচ্ছে।”

একই সুর শোনা গেল প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান তুহিনের কণ্ঠেও। তিনি অকপটে স্বীকার করেন:

“যারা বিনিয়োগ করছেন তারা কেউই পূর্ণাঙ্গ দলিলাদি কিংবা এসব অনুমোদন দেখতে চায় না। শুধু বিশ্বাসের ওপর ভর করে প্রয়াত দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর পুত্র সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর বক্তব্য শুনে বিনিয়োগ করছেন।”

বায়নাকৃত জমিতেও আইনি জটিলতা ও নিষেধাজ্ঞা

ইস্তানবুল হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি এম এমদাদুল হক ১৬ জনের কাছ থেকে ১৭.৫৫৯ বিঘা জমির বায়না দলিল করার দাবি করলেও, খোদ সেই বায়নাকৃত জমির মালিকানা নিয়েই চলছে তীব্র আইনি লড়াই:

  • দেওয়ানি মামলা: জমির উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা দাবি করে পটুয়াখালীর যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা কাজলী বেগম, নাজমুন নাহার, আসলাম ও লিটন মিয়া। মামলা চলমান থাকায় খেপুপাড়া সাবরেজিস্ট্রি অফিস শর্ত দিয়েছে যে, বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারের অনুমতি ছাড়া এই জমি হস্তান্তর করা যাবে না।

  • রাখাইন সম্প্রদায়ের দাবি: কুয়াকাটার বালিয়াতলীর হাড়িপাড়া রাখাইন পল্লিও এই জমির মালিকানা দাবি করেছে। রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বোচান প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জানান, সিএস, আরএস ও এসএ রেকর্ডে জমিটি তাদের পূর্বপুরুষদের নামে থাকলেও প্রভাবশালীরা সেখানে সীমানা প্রাচীর দিচ্ছে। এর প্রতিকারে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন তিনি, যেখানে ইস্তানবুল হোটেলের জমিদাতা দাবিদার আব্দুল জব্বার হাওলাদারসহ ৮৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের সাফাই

সব জটিলতা অস্বীকার করে ইস্তানবুল হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি এম এমদাদুল হক দাবি করেন, তারা এ পর্যন্ত ১৯ একর জমি কিনেছেন এবং পরিকল্পনা আরও বর্ধিত (এক্সটেনশন) করা হচ্ছে। রাখাইন সম্প্রদায়ের দাবিকে ‘ভিত্তিহীন ও ভুয়া’ বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তিনি।

অন্যদিকে, কুয়াকাটা পৌরসভার সচিব মো. জসিম উদ্দীন এই স্পর্শকাতর প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন এবং “পৌরসভায় নতুন যোগ দেওয়ায় বিস্তারিত জানেন না” বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

পর্যটন এলাকায় শেয়ার বিক্রির নামে প্রতারণার মহোৎসব

শুধু ইস্তানবুল হোটেলই নয়, কুয়াকাটা ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় হোটেল-মোটেল নির্মাণের নামে অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে শেয়ার বিক্রির ফাঁদ পেতেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে ৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনৈয়মের তথ্য মিলেছে, যার মধ্যে ৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিলেছে ভয়াবহ জاليةতির প্রমাণ।

বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই না করে কেবল রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের ‘নামের ওপর ভরসা করে’ লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করার কারণেই ইস্তানবুল হোটেলের মতো প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সাহস পাচ্ছে।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৪৬
  • ১১:৫২
  • ৪:২৭
  • ৬:৩৩
  • ৭:৫৫
  • ৫:০৮