
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। সেই সংকটময় মুহূর্তে শেখ হাসিনাকে নিরাপদে দিল্লিতে পৌঁছাতে এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের নিরাপদ হেফাজতে নিতে যে ক’জন সামরিক কর্মকর্তা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদেরই একজন কর্নেল জিএম রাজিব আহমেদ। এবার সেই বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা ও মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের অত্যন্ত অনুগত ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তার পদোন্নতির খবরে খোদ সেনাবাহিনীর ভেতরে এবং ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে বঞ্চিত ও নির্যাতিত দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের মাঝে রাজিবের এই পদোন্নতির খবর নতুন করে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়েছে। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের প্রশ্ন—যেখানে ফ্যাসিস্টের দোসর ও সহযোগী হিসেবে এই সেনা কর্মকর্তার চাকরিই থাকার কথা নয়, সেখানে উল্টো তাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হলো কীভাবে?
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিতর্কিত পদোন্নতি বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করার পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তির কাছে একটি চরম ভুল বার্তা দেবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হত্যা ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত রাজিবের এই পদোন্নতির পেছনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত একজন প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তার হাত রয়েছে। ওই কর্মকর্তা বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
তখনো ওই প্রভাবশালী কর্মকর্তার সুপারিশেই রাজিবের ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো হয়েছিল। তাকে টিম কমান্ডার [Contg Comd. BANBAT-8(66 EB), UNMISS] হিসেবে দক্ষিণ সুদানে পাঠানো হয় এবং সম্প্রতি মিশন সম্পন্ন করে তিনি দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পরপরই গত মঙ্গলবার তাকে কর্নেল থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
প্রতিরক্ষা সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহকারী সামরিক সচিব (এএমএসপিএম) হিসেবে যোগ দেন কর্নেল রাজিব। পরে কর্নেল পদে পদোন্নতি পাওয়ার সাথে সাথে তাকে উপসামরিক সচিব হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পদায়ন করা হয়। তিনি শেখ হাসিনা ছাড়াও তার বোন শেখ রেহানা এবং শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের খুবই ঘনিষ্ঠ ও অন্ধ অনুগত ছিলেন। নিরেট আওয়ামী সমর্থক হওয়ায় বিশ্বস্ততার পুরস্কারস্বরূপ তাকে এই স্পর্শকাতর জায়গায় পদায়ন করা হয়েছিল।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন কর্নেল রাজিবের ভূমিকা নিয়ে দুটি তথ্য পাওয়া গেছে। একটি সামরিক সূত্রের দাবি—শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে পৌঁছে দিতে অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজিব নিজেও বিমানে ছিলেন। তবে অন্য একটি সূত্রের মতে, তিনি সব প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি যুক্ত থাকলেও শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে যাননি; বরং ঢাকায় অবস্থান করে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের নিরাপদ হেফাজতে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেন।
উল্লেখ্য, জুলাই আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনা এই রাজিবের মাধ্যমেই মাঠ পর্যায়ের বাহিনীকে ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ দিতেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনা ও কর্নেল রাজিবের এমনই একটি টেলিফোন কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
উক্ত অডিওতে শোনা যায়, শেখ হাসিনা নিজে ফোন করে মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডার ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হওয়ার তথ্য রাজিবকে দিচ্ছেন এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলছেন:
“ওরা কিন্তু জায়গায় জায়গায় জমা হতে শুরু করেছে। শুরুতেই কিন্তু ই… করতে হবে। জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে করতে হবে। অল্প জমায়েত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যা করার করতে হবে। তাহলে ওরা আর আসবে না। এবারে আর কোনো কথা নয়। এবার শুরুতেই দেবা।”
জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই এমন একজন স্পর্শকাতর ও গণহত্যার নির্দেশ বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তার পদোন্নতিকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না জুলাই আন্দোলনের পক্ষের জনতা ও দেশপ্রেমিক সেনাসদস্যরা।
-দৈনিক আমার দেশ’র প্রতিবেদন অবলম্বনে।