আল-জাজিরা এক্সপ্লেইনার

পাকিস্তানকে ‘‌একঘরে’ করার ঘোষণা দেয়া ভারত এখন ‘‌একঘরে’

পাকিস্তানকে ‘‌একঘরে’ করার ঘোষণা দেয়া ভারত এখন ‘‌একঘরে’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি | ছবি: রয়টার্স

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় একটি জনসভায় পোডিয়ামে হাত চাপড়ে পাকিস্তানের নেতাদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেছিলেন, বিশ্বজুড়ে পাকিস্তানকে একঘরে করতে ভারত সফল হয়েছে এবং এ প্রচেষ্টা আরো জোরদার হবে। ভারত-শাসিত কাশ্মীরে সশস্ত্র যোদ্ধাদের হামলায় ১৮ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার কয়েকদিন পর মোদি এ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি আরো বলেন, সেনাদের এ আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।

কিন্তু ওই জনসভার এক দশক পর চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাকিস্তান বর্তমানে মোটেও বিচ্ছিন্ন হয়নি, বরং তারা চীনের একটি ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চীন সফর করেছেন। পাশাপাশি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও পাকিস্তান ফের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান অসিম মুনির উভয়ই হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেছেন। সর্বশেষ খবর হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধে ইসলামাবাদ প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে এবং ট্রাম্পও প্রায়শই পাকিস্তানি নেতৃত্বের প্রশংসা করছেন।

শরীফ

হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে শাহবাজ শরিফ ও অসিম মুনির। ছবি: হোয়াইট হাউজ

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ট্রাম্পের মন জয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সাফল্য এবং বিশ্বশক্তির কাছে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ করার সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। একইসঙ্গে এটি মোদি সরকারের কিছু ভুল পদক্ষেপকেও সামনে এনেছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, আঞ্চলিক ও বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানকে একঘরে করার ভারতের যে কৌশল ছিল, তা কার্যত উল্টো ফল দিয়েছে।

২০২৫ সালে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ পর্যটক নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের ভেতরে ভারতের সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় দুদেশের মধ্যে চারদিন ধরে সংঘাত চলে। এ সংঘাতে ব্যালিস্টিক মিসাইল, যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের ব্যবহার হয়েছিল। এটি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক লড়াই ছিল এবং এতে সীমান্তের দুই পাশেই বহু মানুষ নিহত হয়।

এ যুদ্ধের পরিপ্রক্ষিতে একইবছরের মে মাসে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি পারমাণবিক অস্ত্রধারী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছেন। তিনি ‌ট্রুথ সোশ্যাল প্লাটফর্মে জানান, মার্কিন মধ্যস্থতায় দীর্ঘ আলোচনার পর দুদেশ অবিলম্বে পূর্ণ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এর পরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার জন্য ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।

তবে শরিফের মতো মোদি এ যুদ্ধবিরতি নিয়ে মুখ খোলেননি। যদিও এর মাত্র কয়েক মাস আগে ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ দেখা গিয়েছিল। পরে ট্রাম্প যখন কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে কাজ করার প্রস্তাব দেন, তখন তা ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ ভারত সব সময়ই কাশ্মীরকে একটি দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে মনে করে এসেছে। যেখানে কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ তারা চায় না। জুনে মোদির কানাডা সফরের সময় ট্রাম্প ওয়াশিংটনে আসার আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফোনালাপে মোদি জানান ভারত কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা মেনে নেবে না। এ যুদ্ধবিরতি সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফল।

ট্রাম্প

ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতে ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

তা সত্ত্বেও ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এ যুদ্ধবিরতি নিজের কৃতিত্ব হিসেবে দাবি করার প্রবণতা বন্ধ হয়নি। তিনি বারবার দাবি করেছেন, তিনিই এ যুদ্ধ এড়িয়েছেন যা লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে পেরেছে। ট্রাম্প এমনকি পাকিস্তানের এ দাবিকেও সমর্থন করেছেন যে সংঘাতের প্রথম দিনেই বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছিল। অন্যদিকে, পহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ ভারত বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করতে না পারায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়। ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার বিষয়ে নয়াদিল্লির দীর্ঘ তিন সপ্তাহের নীরবতা পাকিস্তানের এ আখ্যানকে আরো শক্তিশালী করে এবং পরবর্তীতে ভারতের শীর্ষ জেনারেল বিমান ভূপাতিত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও সংখ্যাটি নির্দিষ্ট করেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পকে এ যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব না দেয়ায় মার্কিন-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। অপরদিকে পাকিস্তান দ্রুত ট্রাম্পের প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে, যা ট্রাম্পকে খুশি করেছে। প্রথম মেয়াদে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করা ট্রাম্প আজকাল পাকিস্তানি সেনাপ্রধান অসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউজে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান এবং তাকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় উপায়ে সম্বোধন করেন, যা নয়াদিল্লির জন্য বেশ অস্বস্তিকর।

দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের প্রতি ‘‌কৌশলগত সংযম’ নীতি অনুসরণ করে আসছিল ভারত। এ কারণে ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পরও ভারত সরাসরি সামরিক আক্রমণ থেকে বিরত ছিল। বিজেপি তখন এ নীতির সমালোচনা করলেও ক্ষমতায় আসার পর মোদি প্রথমে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালের উরি হামলা এবং ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর ভারতের নীতি পুরোপুরি বদলে যায় এবং তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।

কয়েক বছর ধরে ভারতের এ কঠোর অবস্থান কার্যকর মনে হলেও গত বছরের সামরিক সংঘাতের পর সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে। ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের কারণে এমনিতেই দুদেশের ২০ বছরের কৌশলগত সম্পর্কে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছিল। সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারত সফরকালে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে মোদির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করলেও বাণিজ্য নিয়ে চাপ অব্যাহত রেখেছেন। রুবিও জানিয়েছেন, ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যদিও ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে পড়তির দিকে।

ভারতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেছেন, ভারতের সঙ্গে কৌশলগত জোটের ক্ষতি করে অন্য কোনো দেশের সাথে সম্পর্ক গড়ার পক্ষে নন। তবে সামগ্রিকভাবে, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ভারতের এ দীর্ঘদিনের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং নয়াদিল্লির নিজস্ব পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতির কিছু পরিবর্তনের কারণে প্রতিবেশীদের তুলনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়েছে।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৪০
  • ১১:৫৩
  • ৪:২৯
  • ৬:৩৯
  • ৮:০৩
  • ৫:০৪